মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬
৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন অস্ত্রনির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা দিলেন নেতানিয়াহু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম

মার্কিন অস্ত্রনির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা দিলেন নেতানিয়াহু
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মিত্র দেশগুলোর বহুমুখী কূটনৈতিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্রের জন্য প্রধান মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র নির্ভরতা এবার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনতে হবে।

 

একই সঙ্গে নিজেদের জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিজস্ব একটি শক্তিশালী সমরাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সামরিক নীতির কাঠামোগত পরিবর্তনই নয়, বরং ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক মিত্রতার ক্ষেত্রে একটি নতুন ও কৌশলগত মোড় নির্দেশ করে।

 

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সম্প্রতি প্রকাশ করা একটি ভিডিও বার্তায় এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেনাদের উদ্দেশে দেওয়া এক দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই মন্তব্য করেন।

 

সামরিক বাহিনীর সদস্যদের উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে দেওয়া ওই ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, মিত্র দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে যে অকুণ্ঠ সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে, তিনি ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তার গভীর প্রশংসা করেন।

 

তবে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, দীর্ঘমেয়াদে কেবল বন্ধুরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলে চলবে না; বরং এই বিদেশি অস্ত্রনির্ভরতা থেকে ইসরায়েলকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হতে হবে।

 

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নিজেদের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, আধুনিক ও স্বাধীন অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, নেতানিয়াহুর এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সাহসী মন্তব্য এমন এক জটিল ও উত্তেজনাকর সময়ে এল, যখন দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অব্যাহত হামলা কমিয়ে আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেল আবিবের ওপর ক্রমাগত ও জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

 

ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী এবং অবিচল নিরাপত্তা অংশীদার। প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা তেল আবিবকে প্রদান করে আসছে ওয়াশিংটন।

 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং ক্রমবর্ধমান বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি খোদ মার্কিন প্রশাসনও ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক সামরিক কৌশল নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

 

ওয়াশিংটন চাইছে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা যেন কোনোভাবেই একটি সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয়। বর্তমান পরিস্থিতির বাস্তবতায়, দক্ষিণ লেবাননের বিশাল একটি অংশ বর্তমানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অবৈধ দখলে রয়েছে।

 

এই অঞ্চলটিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে তীব্র ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলে আসছে। লেবাননের এই দখলকৃত অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও উপস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো বারবার বিশ্বমঞ্চে সমালোচিত হচ্ছে।

 

এ কারণেই মূলত মার্কিন প্রশাসন চাইছে ইসরায়েল যেন দক্ষিণ লেবাননে তাদের সামরিক আগ্রাসন ও হামলার মাত্রা কিছুটা কমিয়ে আনে এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ প্রশস্ত করে।

 

তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রবল কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার সামরিক সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ অনড় রয়েছেন।

 

তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় জোর দিয়ে বলেছেন যে, মিত্রদের চাপ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনা যাই থাকুক না কেন, ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণ লেবানন দখল করে রাখার কৌশলগত সিদ্ধান্ত থেকে কোনোভাবেই পিছু হটবে না।

 

সেখানে শক্ত অবস্থান বজায় রেখে লেবাননভিত্তিক শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর যাবতীয় সামরিক অবকাঠামো, সুড়ঙ্গপথ এবং অস্ত্রভাণ্ডার সম্পূর্ণরূপে ধূলিসাৎ করার যে সামরিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা যেকোনো মূল্যে অব্যাহত থাকবে বলে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন।

 

সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন অস্ত্রনির্ভরতা রাতারাতি কমানোর এই ঘোষণা বাস্তবায়ন করা ইসরায়েলের জন্য মোটেও সহজ কোনো কাজ হবে না। কারণ, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ভারী সামরিক সরঞ্জামের জন্য তারা এখনো মার্কিন প্রযুক্তির ওপরই ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

 

তবে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তিনি ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও বহুগুণ সম্প্রসারিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত রূপরেখা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন।

 

এর মাধ্যমে তিনি কেবল আন্তর্জাতিক মিত্রদেরই এই বার্তা দিচ্ছেন না যে ইসরায়েল তার নিজস্ব নিরাপত্তা লক্ষ্যের বিষয়ে আপসহীন, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক শক্তির ভারসাম্যেও একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছেন।

 

- আল জাজিরা