দেশটির উগ্র-ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেকোনো সিদ্ধান্ত বা অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার পূর্ণ ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সাহস ইসরাইলের রয়েছে।
একই সঙ্গে লেবাননের সাথে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে তিনি এই ধরনের যেকোনো উদ্যোগকে ইসরাইলের জন্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও হুমকিস্বরূপ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আল-জাজিরার এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং কৌশলগত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মিত্রদের মধ্যে প্রকাশ্য মতপার্থক্যের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ইসরাইলি রক্ষণশীল ও ডানপন্থি গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক ‘আরুতজ শেভা’-এর পক্ষ থেকে করা এক সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির তাঁর এই কড়া ও আপসহীন মন্তব্য করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে যুদ্ধবিরতি বা সামরিক অভিযান কমানোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আপিল বা বিশেষ অনুরোধ আসলে ইসরাইল ঠিক কী করবে, এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তরে তিনি বলেন, ইসরাইল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অবশ্যই সেই অনুরোধ নির্দ্বিধায় নাকচ করে দেওয়ার অধিকার রাখে।
বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বড় সামরিক ও আর্থিক সহায়তাকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানকে উদ্দেশ্য করে ইসরাইলের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর এমন প্রকাশ্য ও দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
লেবানন সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে এই ডানপন্থি নেতার অবস্থান বরাবরই অত্যন্ত আগ্রাসী ও কট্টর। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে লেবানন ফ্রন্টে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ কৌশল কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে বেন-গভির তাঁর চরমপন্থি দৃষ্টিভঙ্গির কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, লেবাননের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইসরাইল যে সামরিক অভিযান বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা কোনোভাবেই মাঝপথে থামানো যাবে না।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ বা পশ্চিমা মিত্ররা যতই চাপ প্রয়োগ করুক না কেন, কোনো অবস্থাতেই উত্তর সীমান্তে অর্থাৎ লেবাননের সাথে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি হতে দেওয়া যাবে না।
তাঁর মতে, সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই কেবল ইসরাইলের নিরঙ্কুশ জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এই ধরনের কট্টর অবস্থান মূলত ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কট্টরপন্থি ও জাতীয়তাবাদী ভোটারদের সন্তুষ্ট করার একটি কৌশল হিসেবেই দেখছেন অনেক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
বৈদেশিক নীতি ও সামরিক অবস্থানের পাশাপাশি ইসরাইলের অত্যন্ত জটিল ও বিভক্ত অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেছেন ইতামার বেন-গভির। চলতি বছর ইসরাইলে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরুকরণ ইতিমধ্যেই জোরদার হতে শুরু করেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনমতের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও তিনি দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী নির্বাচনের পরও তাদের বর্তমান ডানপন্থি গভর্নিং কোয়ালিশন বা উগ্র-জাতীয়তাবাদী জোট সরকার দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকতে সক্ষম হবে।
তবে তিনি বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে এ কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা মোটেও সহজ কোনো কাজ হবে না। জোট সরকারকে আবারও ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে এবং নিজেদের কট্টর রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে তাদের অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
সেই সঙ্গে দেশবাসীর সমর্থন ধরে রাখার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে আপসহীন থাকার কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি মনে করেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বেন-গভিরের মতো কট্টরপন্থি মন্ত্রীদের এমন লাগামহীন ও আগ্রাসী বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে চরম অস্বস্তির জন্ম দেয়।
মার্কিন প্রশাসন যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহত্তর ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে এবং লেবাননসহ অন্যান্য ফ্রন্টে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে এনে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, সেখানে ইসরাইলের শীর্ষ পর্যায় থেকে মিত্রদের প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যান করার এমন ঘোষণা শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও বেশি জটিল, বাধাগ্রস্ত ও দীর্ঘায়িত করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য এই বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ইসরাইলের বর্তমান ডানপন্থি সরকার কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিজেদের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের পথেই অগ্রসর হতে বদ্ধপরিকর।
সার্বিকভাবে, ইতামার বেন-গভিরের এই সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন করে উত্তেজনার পারদ বৃদ্ধি করেছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরাশক্তির কূটনৈতিক চাপকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, নিকট ভবিষ্যতে লেবানন বা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।
ইসরাইলের এই একগুঁয়ে ও আগ্রাসী নীতি শেষ পর্যন্ত মিত্রদের সাথে তাদের সম্পর্কে কতটুকু ফাটল ধরায় এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ঠিক কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর উৎকণ্ঠা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।