বুধবার, জুন ২৪, ২০২৬
১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আগামী সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা- জানাল পাকিস্তান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম

আগামী সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা- জানাল পাকিস্তান
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের বরফ গলাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক পরিসরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত কারিগরি পর্যায়ের শান্তি আলোচনা আগামী সপ্তাহে আবারও শুরু হতে যাচ্ছে।

 

একটি নির্দিষ্ট ও সাময়িক বিরতির পর দেশ দুটির মধ্যে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার বিষয়টি বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান।

 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

 

বিশেষ করে দীর্ঘ কয়েক দশকের জমে থাকা উত্তেজনা কমিয়ে একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে বিবদমান এই দুই দেশের ধারাবাহিক ও ইতিবাচক উদ্যোগ পুরো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে এবং ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

 

বুধবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আয়োজিত এক নিয়মিত ও আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র তাহির আনদারাভি দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল প্রতীক্ষিত তথ্যটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন যে, নিজেদের মধ্যে বিষয়গুলো মূল্যায়নের জন্য নেওয়া সাময়িক একটি বিরতির পর আগামী সপ্তাহের শুরুতেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের উচ্চ পর্যায়ের কারিগরি প্রতিনিধিরা আবারও আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন, "কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা আগামী সপ্তাহেই পুনরায় শুরু হবে। বর্তমানে যে বিরতিটি চলছে, তা সম্পূর্ণ সাময়িক।

 

আলোচনা তার নিজস্ব গতিতেই সুন্দরভাবে এগিয়ে যাবে।" তাঁর এই সুচিন্তিত বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে যে, শান্তি আলোচনার এই চলমান প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অচলাবস্থা বা মতবিরোধ তৈরি হয়নি, বরং এটি আন্তর্জাতিক যেকোনো জটিল চুক্তির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পর্যালোচনার অংশ মাত্র।

 

এর আগে গত সোমবার ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অত্যন্ত দক্ষ ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের মধ্যে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ধরে অত্যন্ত নিবিড়, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও রুদ্ধদ্বার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রাপ্ত প্রতিবেদন এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষই নিজেদের দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য এই সাময়িক বিরতির যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

 

সুইজারল্যান্ডের মনোরম পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি ছিল মূলত দেশ দুটির মধ্যে চলমান দীর্ঘদিনের জটিল সংকট নিরসনে এবং পারস্পরিক আস্থার অভাব দূর করার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যার সরাসরি ধারাবাহিকতায় আগামী সপ্তাহের কারিগরি আলোচনাগুলো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

 

বিবদমান দুই দেশের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার এই জটিল প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরেক প্রভাবশালী দেশ কাতার।

 

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই দুই মধ্যস্থতাকারী দেশের অত্যন্ত অভিজ্ঞ কারিগরি দলগুলো আগামী সপ্তাহগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নিজ নিজ প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাবে।

 

তাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো সদ্য স্বাক্ষরিত 'ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক'-এর সফল ও নিখুঁত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকের সবচেয়ে বড় ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্থায়ী ও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে।

 

এই অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং সময়সীমার মধ্যে দুই দেশের মধ্যকার সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দীর্ঘদিনের জটিল বিষয়গুলোর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো অত্যন্ত সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে পুরো বিশ্ব। সেখানে খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মহামান্য রাষ্ট্রপতিদের উপস্থিতিতে সরাসরি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে 'ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক' নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতির দীর্ঘ ও সংঘাতময় ইতিহাসে এটিকে একটি বিরল, অভাবনীয় ও অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মূলত রাষ্ট্রপ্রধানদের পর্যায়ে স্বাক্ষরিত এই যুগান্তকারী চুক্তির শক্তিশালী ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই বর্তমানের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত আলোচনাগুলো এত দ্রুত সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

 

দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের শীর্ষ নেতাদের এই প্রত্যক্ষ ও আন্তরিক অংশগ্রহণ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, উভয় পক্ষই এখন অতীতের যেকোনো সংঘাতের পথ সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে পারষ্পরিক সম্মান ও শান্তির পথে হাঁটতে প্রবলভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

 

আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের একেবারে শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদারাভি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এবং তার ঠিক পরপরই অনুষ্ঠিত সুইজারল্যান্ডের শীর্ষ সম্মেলন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

 

এই দুটি অভূতপূর্ব ঘটনা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার যেকোনো ধরনের গভীর বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে পারস্পরিক সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক প্রক্রিয়াই হলো সবচেয়ে কার্যকর, দীর্ঘস্থায়ী এবং নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার। অস্ত্রের ঝনঝনানি বা সামরিক মহড়া নয়, বরং আলোচনার টেবিলই পারে বড় বড় সংকটের সমাধান দিতে।

 

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার এই দীর্ঘ, বন্ধুর ও জটিল যাত্রায় আগামী সপ্তাহের কারিগরি আলোচনাগুলো ঠিক কতটা সফলতা বয়ে আনতে পারে, এখন কেবল সেদিকেই গভীর মনোযোগ ও চরম উৎকণ্ঠার সঙ্গে তাকিয়ে আছে পুরো শান্তিকামী বিশ্ব।

 

আনাদোলু এজেন্সি