বুধবার, জুন ২৪, ২০২৬
১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেতানিয়াহুকে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিন্নের কড়া হুমকি ট্রাম্পের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬, ০৩:১২ পিএম

নেতানিয়াহুকে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিন্নের কড়া হুমকি ট্রাম্পের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার ঐতিহাসিক এবং নিবিড় মিত্রতায় এক অভূতপূর্ব ফাটলের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় প্রস্তাবিত একটি শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে সুস্পষ্ট অস্বীকৃতি জানানোর কারণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে দীর্ঘদিনের এই ঘনিষ্ঠ মিত্রকে ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছিন্ন করার বা প্রতীকী অর্থে ‘বিচ্ছেদ’ ঘটানোর কড়া হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর একগুঁয়ে আচরণের কারণে বিশ্বজুড়ে অবস্থান করা ইহুদি সম্প্রদায়ও তাঁর ওপর মারাত্মকভাবে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশের পর বৈশ্বিক রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর দুই প্রথিতযশা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান এবং জনাথন সোয়ানের যৌথভাবে রচিত একটি নতুন গ্রন্থে দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যকার এই উত্তপ্ত ও সংবেদনশীল ফোনালাপের গোপন তথ্যটি সর্বপ্রথম জনসমক্ষে নিয়ে আসা হয়।

 

গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে সদ্য প্রকাশিত ‘রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’ শীর্ষক এই আলোড়িত বইটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

 

বইটিতে উল্লেখিত বিশদ বিবরণ অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই দুই প্রভাবশালী বিশ্ব নেতার মধ্যে এক অত্যন্ত উত্তপ্ত ও বাদানুবাদপূর্ণ টেলিফোন আলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে ব্যাপক প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে।

 

বইটির তথ্যসূত্র অনুযায়ী, ওই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা সংকট নিরসনে নিজের তৈরি করা একটি বিশেষ শান্তি পরিকল্পনা দ্রুত মেনে নেওয়ার জন্য ইসরায়েলের ওপর তীব্র ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছিলেন।

 

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওই টেলিফোন আলাপের সময় হোয়াইট হাউসে মার্কিন বিশেষ শান্তি দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও সশরীরে প্রেসিডেন্টের পাশেই উপস্থিত ছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথাগত কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

 

ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল-এ প্রকাশিত প্রাসঙ্গিক তথ্য অনুযায়ী, ওই সংবেদনশীল ফোনালাপের একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত রুক্ষ ও কড়া ভাষায় নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, সবাই তাঁর ওপর অত্যন্ত বিরক্ত।

 

ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে তার ডাকনাম ‘বিবি’ সম্বোধন করে বলেন, সব ইহুদিই এখন তার ওপর বিরক্ত হয়ে আছে। এমনকি এই ফোনালাপের সময় তার পাশে উপস্থিত থাকা দুই ইহুদিও তার ওপর বিরক্ত। এই মন্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত তাঁর পাশেই অবস্থান করা কুশনার ও উইটকফের কথা বুঝিয়েছিলেন, কারণ তাঁরা দুজনেই জাতিগতভাবে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন।

 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর বরাতে ওই বইটিতে আরও দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেবল বিরক্তি প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি; বরং তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি প্রদান করেছিলেন।

 

ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, সবাই তাকে ঘৃণা করে, কিন্তু এই চরম বৈরী পরিস্থিতিতেও তিনি একা তার পাশে থেকেছেন। যদি ইসরায়েল এই প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তবে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ ও ঐতিহাসিক সম্পর্কে স্থায়ী ফাটল ধরবে এবং চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটবে বলেও তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন।

 

এই ধরনের সরাসরি হুমকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে নিতান্তই বিরল বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির পেছনে একটি দীর্ঘ পটভূমি রয়েছে।

 

উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার প্রাথমিক সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জনসমক্ষে নিজেদের মধ্যকার এই নিবিড় সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

 

সেই সময় দুই নেতার সম্পর্ককে অবিচ্ছেদ্য বলেই মনে করা হচ্ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ইরানকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে মিত্র বাহিনীর ব্যর্থতা এবং গাজা কেন্দ্রিক শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়ার পর থেকেই পরিস্থিতির পটপরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।

 

বিশেষ করে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ নীতি এবং নেতানিয়াহুর অনমনীয় মনোভাবের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমান্বয়ে চরম অসন্তুষ্ট ও প্রকাশ্যে সমালোচনামুখর হয়ে ওঠেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে এই ফোনালাপের মতো রূঢ় বাকবিতণ্ডার ঘটনাটি ঘটে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার এই ধরনের ফোনালাপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে এসেছে।

 

কিন্তু গাজা উপত্যকায় চলমান মানবিক সংকট এবং এর জেরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া চাপের কারণে ওয়াশিংটনও অস্বস্তিতে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষার্থে এই শান্তি চুক্তিটি বাস্তবায়ন করতে মরিয়া ছিলেন।

 

অন্যদিকে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জোটের কট্টরপন্থীদের চাপে এবং নিজস্ব রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে কোনো ধরনের আপস করতে রাজি হচ্ছিলেন না। দুই নেতার এই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতই শেষ পর্যন্ত তাদের দীর্ঘদিনের মিত্রতায় এমন তীব্র ফাটল ধরিয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের পর আন্তর্জাতিক মহল এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

- আরটি অনলাইন