বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনে যাচ্ছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনে যাচ্ছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দল
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনা প্রশমন এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে এক বড় ধরণের অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জাতিসংঘের বিশেষ পারমাণবিক পরিদর্শক দল শীঘ্রই ইরানের অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনে যাচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বুধবার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই পরিদর্শনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, তাঁর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল খুব দ্রুতই এই পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে।

 

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার এই অবস্থানকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে জোরালো এবং তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

 

বিগত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে তীব্র সামরিক সংঘাতের পর থেকেই তেহরান তাদের দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে জাতিসংঘের পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।

 

আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা, এই অন্তর্বর্তী সময়ে ইরান তাদের গবেষণাগারগুলোতে এমন বিপুল পরিমাণ উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করতে সক্ষম হয়েছে, যা দিয়ে তারা চাইলে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তত ১০টি শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে।

 

তবে পশ্চিমা দেশগুলোর এই আশঙ্কাকে বরাবরই ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, তাদের এই পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

 

ইরান বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে কোনো ধরনের সামরিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি ছাড়াই ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাধারণত পারমাণবিক বোমার মতো ধ্বংসাত্মক সমরাস্ত্র তৈরি করতে অন্তত ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়, যা ইরান এখনও তৈরি করেনি বলে তাদের দাবি।

 

জাতিসংঘের এই পরিদর্শক দলের আগমনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পরস্পরবিরোধী ও দ্বিমুখী বক্তব্য সামনে এসেছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়েছে যে, তেহরান আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের তাদের স্থাপনায় প্রবেশের অনুমতি দিতে চূড়ান্তভাবে সম্মত হয়েছে।

 

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, তারা কোনো অবস্থাতেই বহিরাগত পরিদর্শক দলকে তাদের দেশের সার্বভৌম সীমানার ভেতরে প্রবেশ করতে দেবে না।

 

দুই দেশের এই কূটনৈতিক রেষারেষির মধ্যেই আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান তাঁর দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং চলমান জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়েছেন। জাপানের সুনামি-বিধ্বস্ত ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে রাফায়েল গ্রোসি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এই সংকটের আইনি ও বাস্তবসম্মত দিকগুলো তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন যে, যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভিন্ন বিবৃতি কিংবা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসাটা খুবই স্বাভাবিক এবং তিনি এগুলো খুব ভালোভাবেই বোঝেন। তবে রাজনৈতিক বিবৃতির বাইরে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, দুই দেশের রাষ্ট্রপতিদের দ্বারা সরাসরি স্বাক্ষরিত একটি বৈধ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমঝোতা স্মারক বর্তমানে বলবৎ রয়েছে।

 

সেই দলিলে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের সমস্ত পারমাণবিক স্থাপনার সার্বিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।

 

সংস্থার প্রধান আরও যোগ করেন যে, চুক্তির এই অলঙ্ঘনীয় শর্তটি কার্যকর করতে হলে জাতিসংঘের পরিদর্শক দলের জন্য স্থাপনাগুলো সশরীরে পরিদর্শন করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ নেই। তাই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তেহরান বা ওয়াশিংটন বাইরে যা-ই বলুক না কেন, পরশু দিন হোক কিংবা আগামী দশ দিন পর হোক, এই পরিদর্শন নিশ্চিতভাবেই সংঘটিত হতে যাচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এই পরিদর্শন কার্যক্রমটি অত্যন্ত জরুরি ও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই চুক্তির মূল লক্ষ্যই হলো ইরানের কাছে থাকা উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিপজ্জনক মজুতকে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী নিরাপদ ও নিম্ন স্তরে নামিয়ে আনা, যা এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।

 

- ডন