বুধবার, জুন ২৪, ২০২৬
১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে নতুন করিডোর চালু করল ওমান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে নতুন করিডোর চালু করল ওমান
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ওমান।

 

এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নৌপথে স্বাধীন ও নির্বিঘ্ন আন্তর্জাতিক নৌচলাচল নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট ও মহৎ লক্ষ্যে একটি অস্থায়ী সামুদ্রিক করিডোর বা নতুন নৌপথ চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।

 

বুধবার, ২৪ জুন তুরস্কভিত্তিক স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রকাশিত এক বিস্তৃত ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈশ্বিক অগ্রগতির বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

ওমান সরকারের দায়িত্বশীল ও উচ্চপদস্থ সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক নৌ চলাচলকে সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক করতে জাতিসংঘের অধীনস্থ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার অত্যন্ত নিবিড় সমন্বয়, কারিগরি সহায়তা ও নিবিড় পরামর্শের মাধ্যমেই এই যুগান্তকারী ব্যবস্থাটি সাফল্যের সঙ্গে চালু করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের এক বিরাট অংশের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হওয়ার কারণে এর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

 

এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রণালির প্রতি ওমানের যে ঐতিহাসিক, কৌশলগত ও নৈতিক দায়িত্ববোধ রয়েছে, মূলত সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই এই নতুন সামুদ্রিক করিডোর খোলার মতো একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন এবং জাতিসংঘের সমুদ্র বিষয়ক সনদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বিশ্বের সব দেশের জন্য নৌচলাচলের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার যে সুদৃঢ় অঙ্গীকার ওমান সরকার করে আসছে, এটি তারই এক বাস্তব ও সময়োপযোগী প্রতিফলন।

 

এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও স্বস্তিদায়ক বিষয় হলো, এই নতুন ও সম্পূর্ণ নিরাপদ সামুদ্রিক করিডোর ব্যবহার করে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক কোনো বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর কোনো ধরনের ট্রানজিট ফি বা টোল আরোপ করা হবে না বলে ওমানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

ওমানের এই মহানুভবতা বিশ্ববাণিজ্যের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে পরিবহন ব্যয় হ্রাস করতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

 

এই সামুদ্রিক করিডোরটি আপাতত অস্থায়ীভাবে চালু করা হলেও, হরমুজ প্রণালির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ নৌচলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ওমানের অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বৃহত্তর স্বার্থে ওমান এবং ইরান ইতিমধ্যে যৌথভাবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মপরিষদ গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক।

 

দুই দেশের অত্যন্ত দক্ষ নৌ ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এই বিশেষ পরিষদ আগামী দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালিতে সার্বিক নৌচলাচল ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে অত্যাধুনিক সামুদ্রিক সেবা প্রদান এবং এর আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্ধারণের মতো অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করবে এবং একটি চূড়ান্ত ও সর্বসম্মত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে।

 

হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট এই নতুন ও অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবেশের পেছনে মূলত সদ্য স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক অত্যন্ত কার্যকর ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক এই ঐতিহাসিক স্মারকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ পাঁচ নম্বর ধারা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন পরিচালনা এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য সামুদ্রিক সেবার মান উন্নয়ন নিয়ে ওমানের সঙ্গে সরাসরি এবং নিবিড় আলোচনা করতে আইনত বাধ্যবাধকতা রয়েছে ইরানের।

 

এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী সমঝোতা স্মারকটিতে আরও সুস্পষ্টভাবে ও লিখিত আকারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরান আগামী অন্তত ষাট দিনের জন্য পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সব বাণিজ্যিক জাহাজের সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং টোলমুক্ত চলাচল নিশ্চিত করতে নিজেদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ও সামরিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করবে।

 

এই চুক্তির ফলে দীর্ঘদিনের সামরিক অচলাবস্থা ও উৎকণ্ঠা কাটিয়ে এই অত্যন্ত ব্যস্ত রুটে বাণিজ্যিক নৌপরিবহন তাৎক্ষণিকভাবে পুনরায় পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হবে বলে বিশ্ব সম্প্রদায় গভীরভাবে আশাবাদী হয়ে উঠেছে।

 

এই পুরো ইতিবাচক ঘটনাপ্রবাহের নেপথ্যে রয়েছে একটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক শান্তি প্রক্রিয়া। উল্লেখ্য যে, গত চৌদ্দই জুন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র পাকিস্তানের অত্যন্ত সফল, নিরপেক্ষ ও কার্যকর মধ্যস্থতায় মধ্যপ্রাচ্যের দুই চিরবৈরী শক্তি ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ঐতিহাসিক চৌদ্দ দফা সমঝোতায় পৌঁছানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।

 

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার চূড়ান্ত অবসান ঘটানো, সম্ভাব্য একটি সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের বিস্তার রোধ করা এবং দুই দেশের মধ্যে থাকা বিভিন্ন জটিল ও অমীমাংসিত বিষয়গুলো কেবল রাজনৈতিক সংলাপ ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যেই এই অভাবনীয় সমঝোতাটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

 

ওমানের এই নতুন সামুদ্রিক করিডোর চালু করার সাহসী উদ্যোগটি মূলত পাকিস্তান মধ্যস্থতাকৃত সেই বৃহত্তর শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নেরই একটি অত্যন্ত সফল ও দৃশ্যমান প্রাথমিক ধাপ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি