গত বুধবার এই প্রাণঘাতী ও মর্মান্তিক হামলা নিয়ে নতুন করে সংশয়পূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন তিনি। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং হামলার ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে নিহতের পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে।
একটি স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি যখন বিশ্বজুড়ে প্রবল হচ্ছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক উত্তেজনার এক চরম পর্যায়ে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের একেবারে প্রথম দিনে মিনাব শহরের ‘শাজারেহ তায়িবা’ নামক একটি স্বনামধন্য বালিকা বিদ্যালয়ে এক প্রলয়ঙ্কারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
ওই দিনের সেই মর্মান্তিক ঘটনায় ১৭৫ জনেরও বেশি নিরীহ শিশু শিক্ষার্থী এবং তাদের শিক্ষাদানে নিয়োজিত শিক্ষক নির্মমভাবে প্রাণ হারান বলে ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছিলেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো একটি সম্পূর্ণ বেসামরিক এবং সুরক্ষিত জায়গায় এমন ভয়াবহ আক্রমণ বিশ্ববিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। যুদ্ধের ময়দান থেকে বহুদূরে থাকা কোমলমতি শিশুদের এমন অকাল মৃত্যু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং যুদ্ধকালীন নীতিমালার চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই নারকীয় হামলার দায় নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স গত মার্চ মাসে একটি চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওই বিশেষ প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, মর্মান্তিক ওই হামলার জন্য সম্ভবত মার্কিন সামরিক বাহিনীই দায়ী।
সামরিক বাহিনীর পুরনো, সেকেলে ও ত্রুটিপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ভুলবশত এই প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে সেই সময় সামরিক বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হয়েছিল।
এই তথ্যের পর মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন বিশ্ববাসীর সমালোচনার মুখে তাদের তদন্তের পরিধি আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার ঘোষণা দেয়। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পেন্টাগন এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক, স্বচ্ছ বা চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেনি, যা ঘটনাটির স্বচ্ছতা নিয়ে আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
এই চরম অস্পষ্টতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মাঝেই গত বুধবার গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আদৌ এই জটিল বিষয়ের কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান করতে পারবে কি না, তা নিয়ে তিনি নিজেই গভীর সন্দিহান।
প্রকৃত দোষ কার ছিল, কোন পক্ষের ছোঁড়া অস্ত্রে এতগুলো প্রাণ ঝরে গেল, তা হয়তো কখনোই চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এর পেছনের যুক্তি হিসেবে তিনি যুদ্ধকালীন চরম বিশৃঙ্খলার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন যে, ওই নির্দিষ্ট সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে চারদিক থেকে অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হচ্ছিল। মিনাবের স্কুলে যা ঘটেছে তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক একটি ঘটনা, কিন্তু সেসময় আকাশের সর্বত্রই অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র উড়ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হামলার দায়ভার নিজের দেশের সেনাবাহিনীর ওপর বর্তানোর প্রবল সম্ভাবনাকে প্রায় নাকচ করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও বলেন, অনেকেই এখন দাবি করছেন যে মিনাবের ওই স্কুলে আঘাত হানা অস্ত্রটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র ছিল।
কিন্তু বাস্তবে হয়তো বিষয়টি একেবারেই তেমন নয়। এই হামলা মার্কিন বাহিনী করেছে, এমনটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ তিনি এখন পর্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে দেখেননি বলে জানান। তাই তিনি মনে করেন না যে, এই ভয়াবহ হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, এই মর্মান্তিক ঘটনার পরপরই বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। বিশেষ করে শিশু শিক্ষার্থীদের নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছিল।
সংস্থাটি এই জঘন্য হামলাকে ‘সম্পূর্ণ ভয়াবহ’, অমানবিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছিল। ঘটনাটির পর থেকে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্যে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
হামলার একেবারে শুরুর দিকে ট্রাম্প কোনো ধরনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই সরাসরি ইরানকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে এবং ওই অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের খবর প্রকাশের পর তিনি তার প্রাথমিক অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসতে বাধ্য হন।
তিনি তখন স্বীকার করেছিলেন যে, পুরো বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এখনও পুরোপুরি অবগত নন, এর একটি নিবিড় তদন্ত চলমান রয়েছে এবং কেউই ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো বেসামরিক স্কুলের ওপর এমন প্রাণঘাতী হামলা চালায়নি।