শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২৬
১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজে টোল বসিয়ে বছরে চার হাজার কোটি ডলার আদায়ের বড় পরিকল্পনায় ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬, ০৫:০২ পিএম

হরমুজে টোল বসিয়ে বছরে চার হাজার কোটি ডলার আদায়ের বড় পরিকল্পনায় ইরান
ছবি: Collected

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর টোল আরোপ করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এই পরিকল্পনার আওতায় ইরান সরকার প্রতি বছর প্রায় চার হাজার কোটি মার্কিন ডলার রাজস্ব আদায় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে ইরানের এই বিশাল অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে তেহরানের এই উদ্যোগ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ঐ বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তেহরান মূলত নিজেদের ভূখণ্ড এবং জলসীমার সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার যুক্তি দেখিয়ে এই টোল আদায় করতে চাইছে। তাদের দাবি, এই প্রণালি ব্যবহারকারী বিদেশি জাহাজগুলোকে নিজেদের নিরাপদ চলাচলের স্বার্থেই ইরান সরকারকে নির্দিষ্ট হারে টোল প্রদান করতে হবে।

 

শুধু তাই নয়, এই সিদ্ধান্তে আঞ্চলিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে ইরান ইতিমধ্যে প্রতিবেশী উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয়টি প্রভাবশালী দেশ-সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা সম্পন্ন করেছে।

 

এমনকি, টোল থেকে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ হিস্যা বা লভ্যাংশ হিসেবে এই ছয়টি দেশকেও প্রদান করা হবে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। হরমুজ প্রণালির কৌশলগত ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বিশ্ব অর্থনীতিতে অপরিসীম। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অত্যন্ত সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হিসেবে স্বীকৃত।

 

সারা বিশ্বে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়, তার প্রায় ২০ শতাংশই এই নির্দিষ্ট জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালির ওপর যেকোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ বা বাধা সৃষ্টি হলে তা সরাসরি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

 

অতীতে এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ সম্পূর্ণ বাধাহীনভাবে ও মুক্তভাবে চলাচল করতে পারত। কিন্তু বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।

 

এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান সরকার হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করে। ইরানের এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটে, যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।

 

হরমুজ প্রণালিতে ওই অবরোধ জারির সময়ই ইরানের সরকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছিল যে, যেহেতু এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের একটি বড় অংশ ইরানের সার্বভৌম মানচিত্র ও জলসীমার আওতাভুক্ত, তাই বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এই পথ ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই নির্দিষ্ট ফি বা টোল প্রদান করতে হবে।

 

তেহরান তাদের এই দাবিকে আইনি বৈধতা দিতে গত মার্চ মাসে ইরানের পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত একটি নতুন আইনও সর্বসম্মতিক্রমে পাস করেছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই ইরানের এই একতরফা সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে এবং এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তারা ইরানের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতেও কঠোর অবরোধ জারি করেছিল।

 

সাম্প্রতিক সময়ে এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং দেশটির অন্যতম শীর্ষ নীতিনির্ধারক মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ওমান সফরে যান।

 

সেখানে হরমুজ প্রণালি থেকে টোল আদায়ের বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট বার্তা দিয়ে ঘালিবাফ বলেন, পুরো বিশ্বের এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানা থাকা উচিত যে, হরমুজ প্রণালির সার্বিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণ আর কোনোভাবেই যুদ্ধপূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে না।

 

তার এই বক্তব্য মূলত জলপথটির ওপর ইরানের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারই একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। অন্যদিকে, বাঘের ঘালিবাফের এই কঠোর বার্তার পরপরই ইরানের সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

 

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইন সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও গতকাল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই বিষয়ে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে টোল আরোপ করার কোনো আইনগত অধিকার পৃথিবীর কোনো একক দেশের নেই।

 

তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যতে যে চুক্তিই স্বাক্ষরিত হোক না কেন, কোনো চুক্তিতেই হরমুজ প্রণালি থেকে টোল আদায় সংক্রান্ত কোনো শর্ত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র তা কখনোই মেনে নেবে না।

 

মার্কো রুবিও আরও সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আজ ইরানের এই একতরফা টোলনীতি মেনে নেয়, তবে তা একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য দেশও তাদের সীমানাভুক্ত আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক চলাচলের ওপর নিজেদের ইচ্ছামতো টোল আরোপ করা শুরু করবে।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক জলপথ কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা রাষ্ট্রের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। এটি আধুনিক বিশ্বের একটি অত্যন্ত মৌলিক ও সার্বজনীন নীতি। এই নীতির ব্যত্যয় ঘটলে সমগ্র বিশ্ববাণিজ্য চরম বিশৃঙ্খলা এবং এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে।

 

তবে এতসব উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারির মধ্যেও আশার কথা হলো, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের স্বাভাবিক চলাচল আবারও বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় ৭০টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে এই প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার একটি বড় ইঙ্গিত। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং এনডিটিভির তথ্যমতে পুরো ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

 

- ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, এনডিটিভি