শনিবার, জুন ২৭, ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানি হামলার জেরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরানোর পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ০১:১৪ পিএম

ইরানি হামলার জেরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরানোর পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক উত্তেজনার জেরে এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

 

মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের কড়া জবাব হিসেবে ইরানের সামরিক বাহিনীর চালানো একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

উদ্ভূত এই অস্থিতিশীল ও চরম সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিজেদের সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা কিছু কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি ইসরায়েলে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন।

 

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রকাশিত এক বিশেষ ও বিস্ফোরক প্রতিবেদনে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ওই বিস্তৃত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটিটি বড় পরিসরে সংস্কার ও পুনর্গঠন করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ওয়াশিংটন।

 

এর পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ পাল্টে যাওয়ায় কুয়েত ও সৌদি আরবের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোতেও দীর্ঘদিনের মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং লজিস্টিক সাপোর্ট উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা হতে পারে বলে দৃঢ়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

 

এই স্পর্শকাতর বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মার্কিন প্রশাসনের অন্তত দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমটিকে নিশ্চিত করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নাজুক যুদ্ধাবস্থা ও ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করে ওয়াশিংটন প্রশাসন চাইলে খুব শিগগিরই এই অঞ্চলের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো তাদের প্রধান মিত্র দেশ ইসরায়েলে স্থানান্তর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

 

প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর আকস্মিক ও যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

 

মার্কিন ও ইসরায়েলি ওই আগ্রাসী আক্রমণের তাৎক্ষণিক জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অত্যাধুনিক আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে অত্যন্ত ভয়াবহ ও নিখুঁত হামলা চালায় ইরান।

 

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলায় সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরটি। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের নিজস্ব অনুসন্ধান ও বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরানি সামরিক বাহিনীর এসব অব্যাহত ও সুনির্দিষ্ট হামলায় মার্কিন কমান্ড সদর দপ্তরসহ ওই অঞ্চলের আরও অন্তত এক ডজন সামরিক স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

তবে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর বা পেন্টাগন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই ক্ষতির প্রকৃত পরিসংখ্যান কিংবা বিস্তারিত কোনো তথ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বা জনসমক্ষে প্রকাশ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত রয়েছে।

 

অন্যদিকে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক পরিমণ্ডলেও চলছে নানা ধরনের তৎপরতা ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক। তবে চলমান এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ নিয়ে খোদ মার্কিন নাগরিকদের মনে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সংশয় দানা বাঁধতে শুরু করেছে।

 

পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করতে এবং একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ বের করতে সম্প্রতি যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ বা এমওইউ নামে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।

 

এই গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত চুক্তির শর্তাবলি অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজতে বর্তমানে বিবদমান উভয় পক্ষের মধ্যে ৬০ দিনের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর রয়েছে। এই সময়সীমায় কোনো পক্ষই নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন চালাবে না বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।

 

তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা ও সফলতা নিয়ে ব্যাপক মাত্রায় প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মূলত ‘ইরানি সামরিক হুমকি চিরতরে দূর করতে’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই রক্তক্ষয়ী সামরিক যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশাল সামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়াই ছিল এই বহুল আলোচিত যৌথ সামরিক অভিযানের প্রধান লক্ষ্য।

 

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী পরিচালিত সাম্প্রতিক এক বিশদ জনমত জরিপে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। ওই জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী অন্তত ৬০ শতাংশ মার্কিন সাধারণ ভোটার মনে করেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া এই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের জন্য মোটেও লাভজনক কিংবা ফলপ্রসূ হয়নি, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতিকে আরও নিরাপত্তাহীনতার মুখে ফেলেছে।

 

কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই সময়োপযোগী জনমত জরিপ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে জোরালো ইঙ্গিত দেয় যে, চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারণে এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে সাধারণ জনগণের মনে এক ধরনের গভীর সংশয় ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

 

জরিপে অংশ নেওয়া ৬১ শতাংশ সচেতন নাগরিকই এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সক্ষমতা এবং সম্ভাবনা পুরোপুরি আগের মতোই রয়ে গেছে।

 

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, জাতীয় নিরাপত্তার এই স্পর্শকাতর ইস্যুতে মার্কিন রাজনীতিতে চরমভাবে বিভক্ত থাকা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান-উভয় শিবিরের সমর্থকদের মধ্যেই কোনো ধরনের আদর্শিক মতভেদ দেখা যায়নি।

 

দলমত নির্বিশেষে উভয় রাজনৈতিক দলের কট্টর সমর্থকরাই একমত পোষণ করে মনে করছেন যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মুখেও ইরান এখনো গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার ক্ষমতা রাখে, যা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়েই থেকে যাবে।

 

- ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল