এই চরম উদ্বেগজনক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই নিবিড় টেলিফোন আলাপে উভয় শীর্ষ নেতা নিজ নিজ দেশের পক্ষ থেকে এই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
শনিবার তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, দুই প্রতিবেশী দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যকার এই ফোনালাপ অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক ছিল।
আলাপকালে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালনের বিষয়ে পাকিস্তানের যে অবিচল অঙ্গীকার রয়েছে, তা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেন ইসহাক দার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত পুরো অঞ্চলের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
অন্যদিকে, এই সমগ্র শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান শুরু থেকেই যে অব্যাহত, আন্তরিক ও বলিষ্ঠ সমর্থন জুগিয়ে আসছে, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। একই সঙ্গে সম্প্রতি গভীর সমুদ্রে আটকা পড়া ইরানি নাবিক ও জেলেদের অত্যন্ত নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদ যে ভ্রাতৃত্বসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেছে, সেজন্য তিনি ইরান সরকারের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
কূটনৈতিক এই গুরুত্বপূর্ণ আলাপ এমন এক সংকটময় সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে শুক্রবার ইরানে অবস্থিত বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং রাডার ঘাঁটিতে অতর্কিত ও ব্যাপক হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সম্প্রতি যে প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে, তার পেছনে তেহরানের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও সম্পৃক্ততা রয়েছে।
মূলত সেই হামলার যথোপযুক্ত প্রতিশোধ হিসেবেই এই সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে ওয়াশিংটন জানিয়েছে। তবে মার্কিন এই আগ্রাসী পদক্ষেপের কড়া ও তাৎক্ষণিক জবাব দিতে মোটেও কালক্ষেপণ করেনি ইরান।
দেশটির সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর এই অন্যায্য হামলার প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ হিসেবে তাদের চৌকস নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবস্থানগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের এই আগ্রাসন ও উত্তেজনা অব্যাহত রাখে, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ, ধ্বংসাত্মক এবং চূড়ান্ত জবাব দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই চিরশত্রু দেশের মধ্যে হঠাৎ করে এই সামরিক সংঘাত বেজে উঠলেও, এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে পাকিস্তানের সফল ও ঐকান্তিক মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৪ দফা সংবলিত একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সমঝোতা অর্জিত হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে গত ১৮ জুন ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভাবনীয় সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন, যা সমগ্র বিশ্ববাসীর মনে এক ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছিল।
স্বাক্ষরের পর থেকেই এই চুক্তি কার্যকর রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিশ্চিত করেছিল। এই বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত চুক্তির মূল শর্তগুলোর মধ্যে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান যাবতীয় সামরিক সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটানো, আন্তর্জাতিক অবাধ বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে চলা মার্কিন সামরিক ও নৌ-অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া, এই প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে বর্তমানে উভয় পক্ষের মধ্যে ৬০ দিনের একটি নিবিড় ও স্পর্শকাতর আলোচনা প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
তবে শান্তি প্রক্রিয়ার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময়ে নতুন করে শুরু হওয়া এই পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা পুরো শান্তি উদ্যোগকে শেষ পর্যন্ত কতটুকু বাধাগ্রস্ত করবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শান্তিকামী দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় দেখা দিয়েছে।