তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, শত্রুরা যদি নতুন করে কোনো সংঘাতে জড়ানোর মতো মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে সেই সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিণতি অতীতের যেকোনো সংঘাতের চেয়ে অত্যন্ত ভয়াবহ হবে এবং এতে অভাবনীয় মাত্রায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে।
মূলত আশির দশকে ইরাকের বিরুদ্ধে আট বছরব্যাপী পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ চলাকালীন ইসলামি বিপ্লবী গার্ডবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া এই প্রবীণ সামরিক ব্যক্তিত্ব সম্প্রতি আমেরিকান সংবাদমাধ্যম ‘নিউজ নেশন’ চ্যানেলকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই কড়া বার্তা প্রদান করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর সূত্রমতে, তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার সম্পর্ক এক অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল পর্যায় অতিক্রম করছে।
ইরানিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের বরাত দিয়ে পার্সটুডের প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ওই সাক্ষাৎকারে মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বিগত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈরী সম্পর্কের মূল কারণগুলো নিয়ে গভীরভাবে আলোকপাত করেছেন।
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, গত সাতচল্লিশ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরপর আসা বিভিন্ন প্রশাসনের সাথে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ও গুরুতর সমস্যা হলো চরম আস্থার সংকট।
তার মতে, ওয়াশিংটন কখনোই তেহরানের প্রকৃত অবস্থানকে সঠিকভাবে শোনার, গভীরভাবে বোঝার এবং বিশ্বাস করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। এর পরিবর্তে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা সবসময়ই ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থাগুলোর সরবরাহ করা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য অথবা ইরানের প্রতি তীব্র বিরাগভাজন ও শত্রুভাবাপন্ন গোষ্ঠীগুলোর ইঙ্গিতের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।
অন্য শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই ভুল পথে পরিচালিত হওয়াই আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ও সমস্যা বলে তিনি মনে করেন। দীর্ঘদিনের এই বৈরিতা নিরসন করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি টেকসই এবং স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ও অপরিহার্য শর্তাবলি প্রসঙ্গেও এই প্রবীণ সামরিক কর্মকর্তা তার সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, যেকোনো ধরনের গঠনমূলক চুক্তিতে উপনীত হতে হলে মার্কিন সরকারকে সর্বপ্রথম এবং সর্বাগ্রে ইরানি জনগণের ন্যায্য অধিকারগুলোকে নিঃশর্তভাবে স্বীকার করে নিতে হবে।
ওয়াশিংটনকে এই চরম সত্যটি মেনে নিতে হবে যে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে ইরানি জনগণের নিজস্ব অধিকার রয়েছে এবং তারা সর্বদা আন্তর্জাতিক আইনের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থেকেই নিজেদের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তেহরানের সম্পর্কগুলোও পুরোপুরি আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। স্থায়ী চুক্তির ক্ষেত্রে পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তিনি দীর্ঘস্থায়ী ও অমানবিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন দেশে বেআইনিভাবে আটকে রাখা বা জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ ইরানি সম্পদ নিঃশর্তভাবে অবমুক্ত করার ওপর জোর দেন।
এ ছাড়া, কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে তিনি তৃতীয় শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই সামুদ্রিক পথটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা মূলত ইরানেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এর ওপর তাদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
কঠোর রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তার পাশাপাশি মার্কিন সাধারণ নাগরিক এবং তাদের পরিবারবর্গের উদ্দেশে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক বার্তাও দিয়েছেন মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি। তিনি অত্যন্ত পরিপক্বতার সাথে মার্কিন সরকার ও সাধারণ জনগণকে দুটি সম্পূর্ণ পৃথক সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি বলেন, ইরানি নেতৃত্ব এবং জনগণ মার্কিন নাগরিকদের তাদের সরকারের আগ্রাসী নীতির সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে না। তেহরান কখনোই চায় না যে, কোনো সাধারণ মার্কিন নাগরিক কোনোভাবেই হয়রানি বা ক্ষতির শিকার হোক।
এ কারণে মার্কিন জনগণের এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানা উচিত যে, ইরানি জনগণ কিংবা ইরান সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ আমেরিকানদের জীবনের ওপর কোনো ধরনের হুমকি বা বিপদের বিন্দুমাত্র আশঙ্কা নেই।
ইরানের মূল লড়াইটি সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়, বরং তাদের লড়াই মার্কিন সেনাবাহিনী এবং মার্কিন সরকারের আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে। সেই আগ্রাসনের বিরুদ্ধেই ইরান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে রুখে দাঁড়ায় এবং নিজেদের আত্মরক্ষার মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করে।
সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি নিজ দেশের ঐতিহাসিক বীরত্ব ও জাতীয়তাবোধের কথা অত্যন্ত গর্বের সাথে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, মার্কিন সরকার এবং এর নীতিনির্ধারক কর্মকর্তাদের এই বিষয়টি খুব ভালোভাবে অনুধাবন করা উচিত যে, ইরানি জাতি কোনো সাধারণ জাতি নয়; তারা এক মহান ও সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের অধিকারী এক বীরত্বপূর্ণ জাতি।
ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, কোনো পরাশক্তির রক্তচক্ষু বা সামরিক হুমকিতে ভয় পেয়ে তারা কখনোই রণাঙ্গন ছেড়ে পিছু হটবে না, বরং নিজেদের আত্মমর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার রক্ষায় তারা শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
পরিশেষে তিনি ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, সংঘাত ও উত্তেজনার এই পথ কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। সুতরাং, মার্কিন প্রশাসনকে অবশ্যই তাদের এতদিনকার অনুসৃত ভুল ও আগ্রাসী পথ থেকে চিরতরে ফিরে আসতে হবে এবং একটি নতুন, সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক পথ গ্রহণ করতে হবে।