শনিবার, জুন ২৭, ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ০৩:২০ পিএম

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তজনা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দুই শক্তির মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থান এবং সামরিক মহড়া এই অঞ্চলকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, যদিও উভয় পক্ষ বর্তমানে একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ-এর আওতায় শান্তি আলোচনার টেবিলে রয়েছে, তবুও এই সমঝোতা অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং যেকোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

রোমের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়া দেসি এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন যে, চলমান উত্তেজনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি হরমুজ প্রণালির ওপর আধিপত্য বিস্তারের এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ।

 

বিশ্লেষক আন্দ্রেয়া দেসির মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই বর্তমানে এমন একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা তাদের জন্য অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তিনি মনে করেন, উভয় পক্ষই অত্যন্ত সচেতন যে পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতি বা সরাসরি কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত তাদের কারও জন্যই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হবে না। তবুও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নেশায় তারা এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে যা উত্তেজনাকে প্রতিনিয়ত উসকে দিচ্ছে।

 

দেসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগামী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এই জলপথের পরিস্থিতি আরও কয়েকবার উত্তপ্ত হতে পারে। এই সময়সীমাটি উভয় পক্ষের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এখানেই প্রমাণিত হবে যে তারা সমঝোতার টেবিলে কতটা আপসহীন অথবা কতটা নমনীয়।

 

এই অস্থিরতা নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই ধমনীর স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শনের যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাকে বিশ্লেষক আন্দ্রেয়া দেসি ‘ক্ষমতার প্রদর্শনী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

তার মতে, উভয় দেশই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এটি বোঝাতে চায় যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের চাবিকাঠি তাদেরই হাতের মুঠোয়। এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই কেবল সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক মর্যাদারও একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই টানাপোড়েন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছে। দেসি সতর্ক করে বলেছেন, উত্তেজনা যখন ক্ষমতার এই উচ্চপর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি বা অনিচ্ছাকৃত কোনো সামরিক উসকানিও যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হাতছাড়া করে দিতে পারে।

 

এতে করে একটি আঞ্চলিক সংঘাত বৈশ্বিক বিপর্যয়ে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভবিষ্যতের শান্তি আলোচনার টেবিলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষক দেসি।

 

তিনি উল্লেখ করেন যে, দুই দেশের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল তাদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কের ওপরই প্রভাব ফেলছে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে।

 

এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই শক্তির রেষারেষি শুধু সরাসরি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্যই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সমুদ্র বাণিজ্যের ওপরও এক দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রাখে।

 

হরমুজ প্রণালির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম, আর সেই জায়গাতেই যখন দুই মহাশক্তি একে অপরের মুখোমুখি অবস্থান নেয়, তখন তার প্রভাব শুধু আকাশ বা সমুদ্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি মূল্যের ওপরও সরাসরি আঘাত হানে।

 

পরিশেষে, আন্দ্রেয়া দেসির বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বর্তমান কূটনৈতিক সমঝোতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল এক ধাপ পার করছে। দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় মর্যাদা ও কৌশলগত স্বার্থের লড়াই থেকে সরে এসে একটি টেকসই শান্তির পথ খুঁজে বের করা।

 

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নেশায় যদি তারা শান্তি আলোচনাকে গুরুত্বহীন করে তোলে, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্য একটি ভয়াবহ বার্তা বয়ে আনবে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আলোচনার মাধ্যমে এই বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো বিকল্প নেই।

 

নতুবা হরমুজ প্রণালি যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে এই দুই শক্তির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যা হয় উত্তেজনা নিরসনে নতুন দ্বার উন্মোচন করবে, নতুবা সংঘাতের নতুন কোনো অধ্যায় সূচিত করবে।

 

- আল জাজিরা