গত শুক্রবার সংঘটিত এই হামলার পর শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি'র বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে এই বিমান হামলা দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ইরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে যেকোনো ধরনের বহিরাগত আগ্রাসন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে এবং এই পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তার নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব রাজনীতিতেও পড়বে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আচমকা হামলায় মূলত দেশটির দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের পর্যবেক্ষণ স্থাপনাগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তেহরানের দাবি অনুযায়ী, এই সামরিক পদক্ষেপটি কেবল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর অনধিকার হস্তক্ষেপই নয়, বরং এটি জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের ৪ নম্বর ধারার একটি সুস্পষ্ট পরিপন্থী কাজ।
একই সঙ্গে, এই আক্রমণ গত ১৭ জুনে স্বাক্ষরিত যুদ্ধ সমাপ্তি সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের প্রথম অনুচ্ছেদকে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করেছে। ইরান প্রশাসন মনে করে, ওয়াশিংটন এই হামলা ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি প্রতিষ্ঠার যাবতীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অবজ্ঞা করেছে এবং পূর্বে সম্পাদিত চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে একতরফা সামরিক আগ্রাসনের পথ বেছে নিয়েছে।
সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার প্রশ্নে তেহরান তাদের অবস্থানে অনড় থাকার বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছে। বিবৃতিতে অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ড ও জানমাল রক্ষার্থে আত্মরক্ষার স্বাভাবিক এবং বৈধ অধিকার রয়েছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তার জাতীয় নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো মূল্যে পূর্ণ শক্তি দিয়ে আত্মরক্ষামূলক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখবে। বর্তমানে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যে প্রতিরক্ষামূলক পাল্টা আঘাত বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, তা মূলত এই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈধ নীতির ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে।
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির কারণে ভবিষ্যতে যে ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক বা রাজনৈতিক পরিণতির সৃষ্টি হবে, তার সমস্ত দায় সম্পূর্ণভাবে আগ্রাসী শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের ওপর বর্তাবে বলে ইরান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
এই সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ তীরবর্তী প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি বিশেষ কূটনৈতিক বার্তা প্রেরণ করেছে। তেহরান এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোকে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ ও আঞ্চলিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার নীতিতে অবিচল থাকার জন্য আন্তরিক আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক আদর্শগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূখণ্ড, আকাশসীমা কিংবা প্রাকৃতিক ও সামরিক সম্পদ যেন কোনো তৃতীয় আগ্রাসী পক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে বা তেহরানের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ না পায়।
আঞ্চলিক দেশগুলোর এই সতর্ক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ইরান মনে করে। সবশেষে, বৈশ্বিক শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে ইরান।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের মহাসচিব, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের গুরুতর এবং ধারাবাহিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদাসীন থাকা মোটেও উচিত হবে না।
আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে এই সংস্থাগুলোর ওপর যে আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তা যথাযথভাবে পালনের জন্য ইরান জোর দাবি জানিয়েছে। তেহরানের এই বিবৃতির পর মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।