মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন হামলার মুখে কঠোর পাল্টা জবাবের কড়া হুঁশিয়ারি দিল ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম

মার্কিন হামলার মুখে কঠোর পাল্টা জবাবের কড়া হুঁশিয়ারি দিল ইরান
ছবি: AA

মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ নতুন করে এক বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ইরানের ওপর কোনো ধরনের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও সমপরিমাণ পাল্টা জবাব দেওয়ার সুস্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে তেহরান।

 

একই সঙ্গে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার ক্ষেত্রে ইরান কোনো ধরনের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না মর্মে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বার্তা পাঠানোর যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন বলে সরাসরি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

মঙ্গলবার রাজধানী তেহরানে আয়োজিত সাপ্তাহিক নিয়মিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এ অবস্থান ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, যেকোনো সামরিক আগ্রাসনের মুখে নিষ্ক্রিয় থাকার ধারণাটি ওয়াশিংটনের একটি চরম আত্মঘাতী দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ চালাবে এবং ইরান তার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না-এমন ভাবনা ওয়াশিংটনের একান্তই এক কাল্পনিক অলীক কল্পনা।

 

ওয়াশিংটন এমন কোনো বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে যার মূল ভিত্তি ছিল সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরানকে আত্মসংবরণ করতে হবে, এমন দাবিকে তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, তেহরান অতীতেও বারবার প্রমাণ করেছে যে তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সুরক্ষার ওপর যেকোনো ধরনের সামরিক আক্রমণকে তারা কখনোই বিনা জবাবে ছেড়ে দেয় না।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া যদি প্রতিপক্ষের আঘাতের চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী নাও হয়, তবে তা নিশ্চিতভাবেই ন্যূনতম সমপরিমাণ সামরিক শক্তির হবে।

 

তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বিভিন্ন দেশে আকস্মিক হামলা চালিয়ে কোনো ধরনের গুরুতর পরিণতি ভোগ না করে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পেত, সেই দিন এখন সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে গেছে।

 

সম্প্রতি ইরানের কুহ-ই কোলং বা পিকঅ্যাক্স পর্বতে মার্কিন হামলার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা খবরের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই কড়া মন্তব্য করেন। পারমাণবিক কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বাঘাই অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কোনো পারমাণবিক আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দেন।

 

তিনি দাবি করেন, তেহরান বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক পারমাণবিক সংলাপে যুক্ত হয়নি, যার ফলে তৃতীয় কোনো পক্ষ হিসেবে রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করার কোনো বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি হয়নি।

 

পারমাণবিক বিষয়ে ইরান নিজেদের পূর্বনির্ধারিত নীতিতে কোনো পরিবর্তন এনেছে বা কোনো ক্ষেত্রে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে-এমন জল্পনাকল্পনা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে তিনি জানান, তার দেশ নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও মৌলিক নীতিমালার বিষয়ে সম্পূর্ণ অটল রয়েছে।

 

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সাম্প্রতিক তেহরান সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি দুই দেশের মধ্যকার নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের অংশীদারিত্বমূলক আলোচনারই একটি সুপরিকল্পিত অংশ, যা বহু মাস আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল।

 

এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ককেশাস অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি, ইউরোপের সংকট, ইউক্রেন সংঘাত, পারস্য উপসাগরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালির নৌ-নিরাপত্তা এবং ইরানের জাতীয় পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়েছে।

 

তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির ক্ষেত্রে মস্কো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এবং বর্তমান উত্তেজনা নিরসনেও তারা গঠনমূলক সহায়তা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

 

ওয়াশিংটনের ওপর ইরানের ঐতিহাসিক ও গভীর আস্থার সংকট থাকা সত্ত্বেও তেহরান কূটনৈতিক পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়নি বলে উল্লেখ করেন এই মুখপাত্র। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, বিশেষ করে ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ঐতিহাসিক পারমাণবিক সমঝোতা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক নানা প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে চলেছে।

 

তবে পূর্ববর্তী তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে কূটনৈতিক পথ সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা কোনো দায়িত্বশীল পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় হতে পারে না। তিনি জানান, যদি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনার বিস্তার রোধ করার সামান্যতম সুযোগও অবশিষ্ট থাকে, তবে ইরান অবশ্যই সেই পথ অনুসন্ধান করবে।

 

তিনি পরিষ্কার করেন যে, জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, যা প্রয়োজনবোধে একদিকে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এবং অন্যদিকে কার্যকর সামরিক প্রতিরক্ষার সাহায্যে নিশ্চিত করা হবে।

 

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েও গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেন ইরানি মুখপাত্র। ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অনুষ্ঠিত ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সমর্থনে গৃহীত একটি প্রস্তাবকে তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

 

বাঘাই জানান, এই প্রস্তাবটি ওআইসির প্রচলিত আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ না করে গৃহীত হয়েছে, তাই একে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই।

 

এছাড়া মুসলিম বিশ্বের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও পারস্পরিক তিক্ততা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে-এমন যুক্তিতে চূড়ান্ত ঘোষণার খসড়া থেকে ইয়েমেন সংক্রান্ত দুটি নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ বাদ দিতে বাধ্য করেছে তেহরান।

 

মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়, বরং তা কেবল ফলপ্রসূ পারস্পরিক সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

 

একই সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বাঘাই বলেন, কোনো তৃতীয় পরাশক্তি বা বিদেশি সামরিক বাহিনীকে যেন তাদের ভূখণ্ড কিংবা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে অন্য কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর হুমকি বা আক্রমণ চালানোর সুযোগ না দেওয়া হয়।

 

প্রতিবেশীসুলভ সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এই ধরনের বৈদেশিক তৎপরতা বন্ধ করা অপরিহার্য। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীলতার জন্য ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি এবং আঞ্চলিক সম্প্রসারণবাদকে সরাসরি অভিযুক্ত করেন।

 

গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ওপর নেমে আসা মানবিক বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরে তিনি পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের একপেশে সমর্থনের তীব্র সমালোচনা করেন।

 

সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে তিনি পাকিস্তান সীমান্তে সাময়িক অচলাবস্থা নিয়ে কথা বলেন এবং জানান যে কারিগরি ত্রুটি ও সীমান্ত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এই সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছে। ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে ইরানকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

- আনাদোলু