মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসন কেবল নিন্দায় সীমাবদ্ধ না - ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম

মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসন কেবল নিন্দায় সীমাবদ্ধ না - ইরান
ছবি : MNA

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন ও মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থাকে (এসসিও) কেবল মৌখিক নিন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জোরালো আহ্বান জানিয়েছে ইরান।

 

দেশটির প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ বলেছেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একতরফা আগ্রাসন ও নিষেধাজ্ঞার মতো যৌথ অর্থনৈতিক হুমকির কার্যকর জবাব দিতে হলে এই জোটের শক্তি সংহত করা এখন সময়ের দাবি।

 

তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে আয়োজিত এসসিওভুক্ত দেশগুলোর সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীদের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া মার্কিন একতরফা পদক্ষেপগুলোর মারাত্মক অর্থনৈতিক কুফল মোকাবিলায় দৃশ্যমান কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

 

তাজিক সরকার ও জনগণের আতিথেয়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এবং সংস্থার মহাসচিব ও কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ দিয়ে তিনি তার নীতিগত বক্তব্য শুরু করেন। সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, যৌথ অর্থনৈতিক হুমকির একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী জবাব কখনোই কেবল বিবৃতির মাধ্যমে নিন্দা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

 

বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং পরস্পরকে পারস্পরিক বাণিজ্যের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তেহরানের পক্ষ থেকে এসসিও ফোরামে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাবনা পেশ করা হয়।

 

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি স্বাধীন এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা, যৌথ উদ্যোগে একটি শক্তিশালী জ্বালানি কনসোর্টিয়াম গঠন করা, নিজস্ব জাতীয় মুদ্রা ব্যবহারের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়ানো এবং আঞ্চলিক ট্রানজিট করিডোরগুলোর সার্বিক উন্নয়ন সাধন করা।

 

তেহরানের মতে, মার্কিন ডলারের ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা হ্রাস এবং নিজেদের অর্থনৈতিক অবকাঠামো শক্তিশালী করার মাধ্যমেই পশ্চিমা একতরফা অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা গড়ে তোলা সম্ভব।

 

সামরিক ও মানবিক দিকগুলো বিশদভাবে তুলে ধরে মোহাম্মদ রেজা আরিফ গত ২৮ ফেব্রুয়ারির সামরিক হামলার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের এক নজিরবিহীন লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি তীব্র ক্ষোভের সাথে স্মরণ করেন যে, সেই দিন ইরানে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে মিনাব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্তত ১৫৭ জন নিষ্পাপ শিশু শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছিল।

 

শিক্ষাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশুদের ওপর এই ধরনের বর্বর আক্রমণ সমগ্র মানবজাতির ওপর চরম আঘাত। আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সনদ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের তোয়াক্কা না করে চালানো সেই সামরিক অভিযানে প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়।

 

একই সাথে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বহু সাধারণ ও নিরীহ বেসামরিক নাগরিককে এবং সরাসরি নিশানা বানানো হয় আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোকে।

 

এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ভাইস প্রেসিডেন্ট দাবি করেন যে, দেশটির সশস্ত্র বাহিনী এবং ঐক্যবদ্ধ আপামর জনগণ বীরত্বের সাথে আক্রমণ প্রতিহত করে আগ্রাসী শক্তির ওপর বড় ধরনের পরাজয় চাপিয়ে দিয়েছে।

 

তিনি হামলাকারীদের সশস্ত্র আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানানোর জন্য এসসিও এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, কেবল নিন্দা জানিয়েই দায় শেষ করা যাবে না, বরং এই নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের যথাযথ আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার আওতায় আনা একান্ত অপরিহার্য।

 

পাশাপাশি সংস্থার কাঠামোর ভেতর সাংস্কৃতিক ও মানবিক সম্পৃক্ততার প্রসারের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মানবিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

 

মোহাম্মদ রেজা আরিফের এই জোরালো বক্তব্য এমন এক সন্ধিক্ষণে প্রকাশ্যে এল, যখন পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও তৎপরতা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

ওয়াশিংটনের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের দিক থেকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত কঠোর ও বৈরী রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, যা দুই পক্ষের মধ্যকার বৈরিতাকে চরম উত্তেজনার পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

 

এই ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে তেহরানও বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়ে আসছে যে, তাদের সার্বভৌম ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর যেকোনো নতুন আগ্রাসনের ক্ষেত্রে আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

 

আঞ্চলিক পর্যায়ে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি ও পারস্য উপসাগরীয় নৌ-সম্পদগুলোকে লক্ষ্য করে তাৎক্ষণিক ও সর্বাত্মক পাল্টা হামলা চালানোর জন্য ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলেও তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

 

বর্তমান বিশ্বের মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এসসিও সম্মেলনে দেওয়া ইরানের এই অবস্থানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ইউরেশীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত জোট হিসেবে এসসিও-র কাছে তেহরানের এই প্রত্যাশা মূলত পশ্চিমা বিশ্বের একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিষেধাজ্ঞার রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বিকল্প অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তোলার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

 

বিশেষ করে চীন, রাশিয়া, ভারত এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্মকে বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ইরানি প্রস্তাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই কূটনৈতিক ও কৌশলগত আহ্বান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কতটা দৃশ্যমান রূপ লাভ করে, তা দেখার জন্য এখন পুরো বিশ্ব গভীর আগ্রহ ও উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টি রাখছে।

 

- মেহের নিউজ