বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬
২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমেরিকানরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে: ইরানের স্পিকার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:০১ পিএম

আমেরিকানরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে: ইরানের স্পিকার
ছবি : File Photo

যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির অভাবনীয় সাফল্যের বিপরীতে বিরোধী রিপাবলিকান পার্টির চরম পরাজয় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই নির্বাচনী ফলাফল কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতেও এর গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরান এই নির্বাচনী ফলাফলকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে। মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরাজয়ের পর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং দেশটির অন্যতম শীর্ষ নীতিনির্ধারক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ একটি অত্যন্ত কড়া ও বিশ্লেষণধর্মী বার্তা দিয়েছেন।

 

তিনি মন্তব্য করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ মূলত যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তির পক্ষে তাদের জোরালো রায় প্রদান করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর বরাত দিয়ে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবরটি জানা গেছে, যা বর্তমানে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি দীর্ঘ ও সুচিন্তিত পোস্টে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল এবং এর অন্তর্নিহিত বার্তা নিয়ে তেহরানের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করেন।

 

তিনি তার বার্তায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, মার্কিন ভোটারদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের নিজস্ব বিবেকবোধ কাজ করুক কিংবা জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মতো অর্থনৈতিক চাপ ভূমিকা রাখুক-মূল বিষয়টি হলো, আমেরিকান জনগণ নতুন করে কোনো যুদ্ধের উন্মাদনাকে পরিষ্কারভাবে ‘না’ বলেছে।

 

গালিবাফ আরও জোর দিয়ে বলেন যে, ইরান মার্কিন জনগণের এই শান্তিকামী বার্তাকে জোরালোভাবে সমর্থন করে। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ এবং দেশটির যুদ্ধবাজ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা টানতে চাইছে।

 

তারা বোঝাতে চাইছে যে, মার্কিন নাগরিকদের সাথে তাদের কোনো বিরোধ নেই, বরং তাদের মূল আপত্তি ওয়াশিংটনের আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

 

মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ তার বার্তায় অত্যন্ত সুকৌশলে এই অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। মার্কিন নাগরিকরা যখন নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন তাদের দেশের সরকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশি যুদ্ধ এবং সামরিক আগ্রাসনের পেছনে ব্যয় করছে।

 

এই চরম বৈপরীত্য মার্কিন সাধারণ ভোটারদের মনে ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। রিপাবলিকান পার্টি সাধারণত বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত কট্টর এবং আগ্রাসী অবস্থান গ্রহণ করে থাকে। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের এই চরম পরাজয়কে ইরান মার্কিন নাগরিকদের যুদ্ধবিরোধী মানসিকতার চূড়ান্ত প্রতিফলন হিসেবে দেখছে।

 

সাধারণ আমেরিকানরা এখন আর তাদের কষ্টার্জিত করের টাকায় মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে সামরিক সংঘাত দেখতে আগ্রহী নন, বরং তারা নিজেদের দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নতি চান।

 

তবে মার্কিন জনগণের এই যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের প্রশংসা করার পাশাপাশি গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক এবং ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি একটি অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন সতর্কবার্তাও উচ্চারণ করেছেন।

 

তিনি তার বার্তায় স্পষ্ট ভাষায় যোগ করেন, আন্তর্জাতিক অর্থদাতা ও ব্ল্যাকমেইলারদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মার্কিন সরকার যদি তাদের নিজেদের জনগণের এই সুস্পষ্ট ইচ্ছার সঙ্গে বিন্দুমাত্র বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তাদের চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে।

 

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি মার্কিন প্রশাসন জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে আবারও যুদ্ধংদেহী নীতি গ্রহণ করে, তবে তারা খুব দ্রুতই জানতে পারবে যে ইরানের ‘না’ এর সঙ্গে তাদের জন্য এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন নেমে আসবে।

 

এই মন্তব্যের মাধ্যমে তেহরান মূলত ওয়াশিংটনকে এই কঠিন বার্তা দিতে চাইছে যে, যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন বা উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত এবং তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন।

 

গালিবাফের বার্তায় উল্লিখিত ‘আন্তর্জাতিক অর্থদাতা ও ব্ল্যাকমেইলার’ শব্দটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইরান সাধারণত এই ধরনের শব্দবন্ধের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সক্রিয় ইহুদিবাদী লবি, অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্র বা মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সকে ইঙ্গিত করে থাকে।

 

তেহরানের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি মূলত এই বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়, যারা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য এবং অস্ত্রের রমরমা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য দশকের পর দশক ধরে সংঘাত জিইয়ে রেখেছে।

 

গালিবাফ মূলত মার্কিন প্রশাসনকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, মুষ্টিমেয় কিছু যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ জনগণের শান্তি ও স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করা হলে, তা যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের জন্যই চরম ভূরাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

 

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক দীর্ঘ কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন রয়েছে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের মধ্যে চরম সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।

 

বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে, যার ফলে ইরানের অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

তবে ইরান সবসময়ই জোর দিয়ে দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং পশ্চিমা বিশ্ব অযৌক্তিকভাবে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনাকর প্রেক্ষাপটে মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় এবং ডেমোক্র্যাটদের বিজয়কে তেহরান কিছুটা হলেও ইতিবাচক ও কৌশলগত দৃষ্টিতে দেখছে।

 

কারণ, কট্টরপন্থি রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটরা অতীতে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি নমনীয়তা দেখিয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং অস্থিতিশীল অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের ছোটোখাটো সংঘাতও মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বিশাল আকার ধারণ করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের এই মন্তব্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

 

ইরান নিজেদেরকে এই অঞ্চলের একটি অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তারা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো ধরনের আঘাত তারা বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে না।

 

মার্কিন প্রশাসন যদি সত্যিই তাদের জনগণের যুদ্ধবিরোধী রায়কে সম্মান জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনে, তবে তা এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।

 

পরিশেষে বলা যায়, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের এই প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির একটি অত্যন্ত নিখুঁত, সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ।

 

তিনি একদিকে মার্কিন সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং শান্তিকামী মানসিকতার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে তাদের যুদ্ধবাজ নীতিনির্ধারকদের কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেস এবং ক্ষমতাসীন প্রশাসন বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করে, তার ওপরেই নির্ভর করবে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা।

 

তবে গালিবাফের এই বার্তার পর এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, তেহরান যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিতে সদা প্রস্তুত এবং তারা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গতিবিধি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশ্ব শান্তির বৃহত্তর স্বার্থে এখন এটাই কাম্য যে, পরাশক্তিগুলো সংঘাতের পথ পরিহার করে গঠনমূলক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সকল বিরাজমান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান করবে।

 

- মিডল ইস্ট আই