আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরায়েল’-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি উঠে এসেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজধানীতে প্রকাশ্য রাজপথে অন্য একটি পরাশক্তি রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে হত্যার এমন সুস্পষ্ট হুমকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক অত্যন্ত নজিরবিহীন এবং উদ্বেগজনক ঘটনা।
এই ঘটনাটি মূলত ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার সমতুল্য বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তেহরানের অত্যন্ত জনবহুল এবং ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এলাকা এনগেলাব স্কোয়ার বা বিপ্লব চত্বরে এই বিশাল এবং দৃষ্টি আকর্ষণকারী বিলবোর্ডটি স্থাপন করা হয়েছে।
বিলবোর্ডটির গ্রাফিক ডিজাইন এবং সেখানে ব্যবহৃত বার্তা অত্যন্ত আগ্রাসী এবং সুস্পষ্ট। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি অন্ধকার গরাদের পেছনে অত্যন্ত বিমর্ষ এবং মাথা নিচু করে বসে থাকা অবস্থায় চিত্রিত করা হয়েছে।
ট্রাম্পের এই বন্দিদশা এবং অসহায়ত্বের ছবির ঠিক ওপরেই অত্যন্ত বড় এবং স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে, ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব’। এই একটি মাত্র বাক্যেই ইরান তাদের চরম প্রতিশোধস্পৃহা এবং আপসহীন অবস্থানের কথা পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে।
পাশেই স্থাপিত আরও একটি বিলবোর্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়েছে। সেখানে একটি জীর্ণ, ছিন্নভিন্ন এবং ধূলিধূসরিত মার্কিন পতাকার পটভূমিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে।
তবে এই ছবিগুলো সাধারণ কোনো প্রতিকৃতি নয়; বরং তাদের প্রত্যেককে রক্তাক্ত মুখমণ্ডল এবং ছিন্নভিন্ন পোশাকে অত্যন্ত করুণ অবস্থায় উপস্থাপন করা হয়েছে, যা শত্রুর চূড়ান্ত পতনের কাল্পনিক দৃশ্যপট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইরান এই নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের তাদের রাষ্ট্রের চরম শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিলবোর্ড উন্মোচনের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার তেহরানের এনগেলাব স্কোয়ারে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষের ঢল নামে। সাধারণ জনতা, রাজনৈতিক কর্মী এবং ধর্মীয় অনুসারীদের এই বিশাল জমায়েত থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র স্লোগান দেওয়া হয়।
উপস্থিত বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে ছিল অসংখ্য লাল পতাকা। শিয়া ইসলামি ঐতিহ্যে এই লাল পতাকা ওড়ানোর অর্থ হলো চরম প্রতিশোধের ডাক দেওয়া-যাঁদের অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের রক্তের সম্পূর্ণ বদলা না নেওয়া পর্যন্ত এই পতাকা নামানো হয় না।
লাল পতাকার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের হাতে থাকা অসংখ্য ব্যানারে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘রক্তপাত হবে’। এই স্লোগান এবং ব্যানারগুলো প্রমাণ করে যে, ইরানের সাধারণ মানুষ এবং কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো যেকোনো মূল্যে শত্রুর ওপর পাল্টা আঘাত হানতে মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত।
পুরো তেহরান শহর যেন এক চরম শোক এবং ক্রোধের আগুনে জ্বলছে, যার একমাত্র লক্ষ্য হলো নিজেদের শীর্ষ নেতার হত্যার চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করা। ইরানের এই চরম আগ্রাসী মনোভাব এবং প্রতিশোধের উন্মাদনার পেছনে রয়েছে একটি গভীর এবং মর্মান্তিক ক্ষত, যা সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে।
আন্দোলনকারী জনতা এবং পুরো ইরানি জাতির এই ক্ষোভের মূল কারণ হলো গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হওয়া এক ভয়াবহ সামরিক হামলা। ওই দিন মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন যুদ্ধের সূচনা লগ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক বাহিনীর এক অতর্কিত এবং সুনির্দিষ্ট হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
কয়েক দশক ধরে ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতা, পররাষ্ট্রনীতি এবং সামরিক কৌশলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি। তার মতো একজন শীর্ষ এবং অবিসংবাদিত নেতাকে হত্যার ঘটনাটি ইরানি জাতির জন্য কেবল একটি বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতাই তৈরি করেনি, বরং এটি তাদের জাতীয় মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
মূলত সেই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ইরান রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করেছিল যে, তারা সঠিক সময়ে এবং সঠিক স্থানে এই চরম অন্যায়ের উপযুক্ত বদলা নেবে। তেহরানের রাজপথে আজকের এই বিলবোর্ড এবং লাল পতাকার আস্ফালন সেই প্রতিশোধেরই এক প্রকাশ্য এবং জোরালো বার্তা।
বিলবোর্ডে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশাপাশি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, স্টিভ উইটকফ এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি ব্যবহারের বিষয়টিও বিশেষ রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। ইরান এই চারজন শীর্ষ নেতাকে আয়াতুল্লাহ খামেনি হত্যাকাণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মূল পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই যৌথ সামরিক জোটকে ইরান তাদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করে। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান শীর্ষ কর্তাদের ঘনিষ্ঠতা এবং ইরানের বিরুদ্ধে তাদের যৌথ সামরিক অভিযান তেহরানকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছে।
বিলবোর্ডে তাদের রক্তাক্ত এবং পরাজিত অবস্থায় দেখানোর মাধ্যমে ইরানের নীতিনির্ধারকরা দেশের সাধারণ জনগণকে এই বার্তা দিতে চাইছেন যে, পরাশক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল অজেয় নয় এবং একদিন তাদেরও চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে।
এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ মূলত দেশের ভেতরে জনসমর্থন অটুট রাখার এবং সামরিক বাহিনীকে উজ্জীবিত করার একটি সুকৌশলী রাজনৈতিক হাতিয়ার। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তেহরানের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন।
শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, তেহরানের রাস্তায় আমেরিকা বিরোধী দেয়ালচিত্র বা স্লোগান নতুন কোনো ঘটনা নয়; ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই এটি ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু একটি সুনির্দিষ্ট বিলবোর্ড তৈরি করে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হত্যার দিনক্ষণ বা অঙ্গীকার ঘোষণা করা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার উসকানিমূলক পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের আর কোনো গোপন বা প্রকাশ্য পথ খোলা নেই।
দুই দেশ এখন পুরোপুরি একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে, যেখানে কোনো পক্ষই বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশঙ্কা করছে যে, ইরানের এই প্রকাশ্য হুমকির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলও তাদের সামরিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করবে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারির সেই যৌথ হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধের ডামাডোল বাজছে, তেহরানের এই বিলবোর্ড যেন তারই এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি। এই যুদ্ধ এবং প্রতিশোধের উন্মাদনা শুধু ইরান বা ইসরায়েলের সীমানাতেই আবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বের ওপর।
বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা-সবকিছুই এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঝুলছে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও, বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে আয়াতুল্লাহ খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা শান্ত করা দেশটির বর্তমান নেতৃত্বের জন্যও একটি বড় সামরিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা এবং সামরিক সক্ষমতা প্রমাণের জন্য হলেও ইরানকে একটি বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানতে হবে বলে মনে করছেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পরিশেষে, তেহরানের এনগেলাব স্কোয়ারে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি সংবলিত এই বিশাল বিলবোর্ড কেবল একটি স্থিরচিত্র নয়; এটি একটি সংঘাতময় ভবিষ্যতের সুস্পষ্ট পদধ্বনি। এটি এমন এক বার্তা, যা ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে তেল আবিব পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষমতার করিডোরে চরম সতর্কবার্তা হিসেবে পৌঁছে গেছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনির রক্ত এবং তার বদলা নেওয়ার শপথ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যে নতুন এবং ভয়ংকর অধ্যায়ের সূচনা করেছে, তার শেষ কোথায় তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্ব এখন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে যে, ইরান তাদের এই প্রকাশ্য হুমকির পর বাস্তবে কী ধরনের সামরিক বা কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং তার জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কতটা আগ্রাসী হয়ে ওঠে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বিশ্বশান্তির জন্য যে কতটা হুমকিস্বরূপ, তেহরানের এই দৃশ্যপট তারই এক ভয়াবহ প্রমাণ।