তাদের পক্ষ থেকে সরাসরি দাবি করা হয়েছে যে, আরব রাজনৈতিক দলগুলো অনৈতিকভাবে ঘুষ প্রদান, অবৈধ বিদেশি অর্থায়ন এবং সংঘবদ্ধ জালিয়াতির মাধ্যমে নির্বাচনের সম্পূর্ণ ফলাফল নিজেদের অনুকূলে নিয়ে গেছে।
তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মতে, নেতানিয়াহুর শিবির এখন পর্যন্ত তাদের এই গুরুতর অভিযোগগুলোর সপক্ষে কোনো ধরনের বিশ্বাসযোগ্য বা বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ জনসমক্ষে হাজির করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
গত ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের সর্বশেষ প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী জোট ১২০ আসনের পার্লামেন্টে মাত্র ৫৩টি আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের ঝুলিতে গেছে ৪৮টি আসন।
কিন্তু এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে আরব রাজনৈতিক দলগুলো। আরবদের প্রতিনিধিত্বকারী 'জয়েন্ট লিস্ট' এবং 'রাআম' নামক দল দুটি সম্মিলিতভাবে মোট ১৯টি আসন জয়লাভ করে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম ৬১টি আসনের প্রয়োজন হয়। বর্তমান ফলাফল অনুযায়ী, কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় এই ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারেনি। ফলস্বরূপ, আরব দল দুটির সমর্থন ছাড়া নেতানিয়াহু বা বিরোধী জোট-কারো পক্ষেই নতুন সরকার গঠন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফলের প্রাথমিক প্রবণতা প্রকাশ হওয়ার পরপরই নেতানিয়াহু এবং তাঁর কট্টর ডানপন্থী মিত্ররা আরব দল দুটির বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে নিয়ে আসেন। কট্টর ইহুদি ডানপন্থী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা এই কল্পিত জালিয়াতির ঘটনায় জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক এই উত্তেজনার পারদ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তাদের কেউ কেউ বর্তমান নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করে নতুন করে পুনরায় ভোট আয়োজনেরও চরমপন্থী আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিরোধী জোটের নেতারা এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বিরোধী জোটের অন্যতম প্রধান নেতা গাদি আইজেনকট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, নির্বাচনে নিজেদের নিশ্চিত পরাজয় ও ক্ষমতা হারানোর ভয়েই নেতানিয়াহু শিবির মরিয়া হয়ে এমন কাল্পনিক অভিযোগ তুলছে।
গত বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, নেতানিয়াহু কেবল নির্বাচনে হেরে গেছেন বলেই রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এসব অবান্তর কথা বলছেন। আগামীকাল, ৪ নভেম্বর, আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের এই পার্লামেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করার কথা রয়েছে।
তবে ফলাফল যাই হোক না কেন, নতুন সরকার গঠন নিয়ে সহসাই কোনো রাজনৈতিক সমাধান আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের এই জটিল সমীকরণের কারণে ইসরায়েলকে আগামী কয়েক সপ্তাহ, কিংবা তারও বেশি সময় ধরে এক চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যেতে হতে পারে।
উল্লেখ্য, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রায় ১৯ বছর ধরে বিভিন্ন মেয়াদে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছেন। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত একটি অভাবনীয় রাজনৈতিক জোট সরকার দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয়েছিল।
ওই সরকারে ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আরব দল রাআমও অংশগ্রহণ করেছিল। তবে মাত্র এক বছরের মাথায় নানা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সেই জোট সরকার ভেঙে পড়ে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ এক রাজনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হলো ইহুদি এবং আরব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সহযোগিতা বা জোট গঠনকে চিরতরে অবৈধ ও অসাংবিধানিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
কারণ, এই ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা তার দীর্ঘদিনের একচেটিয়া ক্ষমতার ভিতকে মারাত্মকভাবে নড়বড়ে করে দিতে পারে। আরব রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর এই বিদ্বেষমূলক প্রচার কেবল নির্বাচনের দিন থেকেই শুরু হয়নি। ভোটের আগে থেকেই এ বিষয়ে এক ধরনের সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আসছিল তাঁর ডানপন্থী জোট।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়েই নেতানিয়াহু এবং রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বেজালেল স্মোট্রিচ আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রায় দুই হাজার বিশেষ পর্যবেক্ষক মোতায়েন করার এক বিতর্কিত পরিকল্পনার কথা জানান।
তাদের রাজনৈতিক বক্তব্যে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এমন একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল যে, আরব অধ্যুষিত ওই কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা রয়েছে। এরপর নির্বাচনের দিন সকালে ভোটের বিনিময়ে সাধারণ নাগরিকদের অর্থ প্রদানের অভিযোগে রাআমের তিন কর্মীকে হঠাৎ করে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এই গ্রেপ্তারের ঘটনাটি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ইসরায়েলের মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার প্রধান কেন্দ্রে চলে আসে। পরবর্তীতে ইসরায়েলের শীর্ষ স্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'চ্যানেল ১২ নিউজ'-এর এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, এই গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশকে প্রথম গোপন তথ্য দিয়েছিলেন স্বয়ং নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফ।
তিনি প্রচলিত কোনো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সরাসরি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে পুলিশের অধিকাংশ আবেদনই স্থানীয় আদালত সরাসরি নাকচ করে দেন এবং তাদের কয়েকজনকে বিনা শর্তে মুক্তিও প্রদান করা হয়।
কিন্তু ততক্ষণে এই সামান্য ঘটনাটি নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এই গ্রেপ্তারের ঘটনাকে সামনে রেখেই নেতানিয়াহুর জোট জোর গলায় দাবি করতে থাকে যে, আরব দলগুলো জালিয়াতির মাধ্যমে নির্বাচনের সম্পূর্ণ ফল নিজেদের পক্ষে নেওয়ার অপচেষ্টা করছে।
ভোট গণনার সময় এই বিদ্বেষমূলক প্রচার আরও তীব্র ও জোরালো আকার ধারণ করে। গত বুধবার নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে, রাআম এবং জয়েন্ট লিস্টের বিরুদ্ধে নির্বাচনে ঘুষ প্রদান, সাধারণ ভোটারদের হুমকি দেওয়া, সহিংসতা সৃষ্টি এবং জালিয়াতির অভিযোগসংবলিত শত শত সাক্ষ্যপ্রমাণ তারা ইতিমধ্যে জমা দিয়েছে।
একই সঙ্গে নেতানিয়াহুপন্থী হিসেবে পরিচিত 'চ্যানেল ১৪' দাবি করে বসে যে, নির্বাচনে বিদেশি কোনো গোপন সূত্র থেকে আরব দলগুলোর কাছে কয়েক কোটি শেকেল (ইসরায়েলি মুদ্রা) অর্থ আসার বিষয়ে তাদের কাছে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
নির্বাচনের পর এই রাজনৈতিক বিতর্কে সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা যোগ হয় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান এবং সুপ্রিম কোর্টের উপপ্রধান বিচারপতি নোয়াম সলবার্গ জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'শিন বেত'-এর প্রধান ডেভিড জিনিকে একটি চিঠি লেখেন।
ওই চিঠিতে নির্বাচনে বিদেশি অর্থায়নের বিষয়ে ওঠা গুরুতর সন্দেহগুলো অবিলম্বে তদন্ত করার অনুরোধ জানানো হয়। তবে পরবর্তীতে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক গোপন বৈঠকের পরই শিন বেত প্রধান ডেভিড জিনি নিজেই নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যানকে ওই চিঠি লেখার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
যদিও সলবার্গ তার চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, এই অভিযোগের পক্ষে থাকা তথাকথিত তথ্যপ্রমাণগুলোর সত্যতা বা গুরুত্ব যাচাই করার কোনো আইনি সুযোগ তার হয়নি। তা সত্ত্বেও, লিকুদ পার্টি এবং অন্যান্য ডানপন্থী রাজনীতিকরা ওই চিঠিটিকেই তাঁদের তোলা অভিযোগের পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেন।
অবশেষে গত রোববার নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান, শিন বেতের প্রধান এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা বা অ্যাটর্নি জেনারেল এক বিশেষ যৌথ বিবৃতিতে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানান যে, নির্বাচন সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও অবাধভাবেই সম্পন্ন হয়েছে।
তারা আরও জানান, বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগের সত্যতা যদি শেষ পর্যন্ত পাওয়াও যায়, তবু তা নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফল পরিবর্তন করার মতো কোনো প্রভাব ফেলবে না। একই সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং গ্রহণযোগ্যতাও এতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।
যৌথ বিবৃতিতে বিচারপতি সলবার্গ দেশের নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, 'ভোটের মাধ্যমে আপনারা যে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানানো হবে।' সব মিলিয়ে, আরব দলগুলোর প্রাপ্ত রেকর্ডসংখ্যক আসন এবারের নির্বাচনে সরকার গঠনের জটিল সমীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর জোটের কাঙ্ক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া এবং আরব দলগুলোর এই অভাবনীয় সাফল্য নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে এক নতুন ও গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আর এই জটিল ও টালমাটাল পরিস্থিতিতে ভোট জালিয়াতির এই অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে কীভাবে ব্যবহার করা হয়, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।