সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম

সৌদি আরবে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সংঘাতপূর্ণ ইয়েমেন এবং প্রতিবেশী সৌদি আরবের মধ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সামরিক দ্বন্দ্বের জেরে নতুন করে পারস্পরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

 

তবে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই আক্রমণ নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঠিক আগেই ইয়েমেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হোদেইদা প্রদেশের বন্দর ও তেল স্থাপনায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।

 

দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপে ওই অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এর ফলে লোহিত সাগর এবং সংলগ্ন অঞ্চলের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এবং সামরিক জোটের পক্ষ থেকে হুথিদের এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইয়েমেনে বৈধ সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি গণমাধ্যমের কাছে এই হামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি সৌদি আরবের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানার আগেই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।

 

এর ফলে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের প্রাণহানি বা বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি। তবে ঠিক কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন এই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল, কৌশলগত নিরাপত্তার কারণে সামরিক জোটের পক্ষ থেকে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।

 

জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি এই হামলাকে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন যে, হুথিরা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা যুদ্ধাপরাধের শামিল।

 

এই আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোতে চরম সতর্কতা জারি করা হয়েছিল, যা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করে। বিশেষ করে আবহা, খামিস মুসাইত, তাইফ এবং নাজরান শহরের বাসিন্দাদের সম্ভাব্য বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

 

স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে সাইরেন বাজিয়ে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই সময়গুলোতে শহরগুলোর রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং সর্বত্র এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে।

 

তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর এবং আকাশসীমা নিরাপদ নিশ্চিত হওয়ার কিছুক্ষণ পরই সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের প্রতি একটি বিশেষ এবং কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়।

 

দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে নাগরিকদের কোনোভাবেই ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন অথবা এগুলো প্রতিহত করার মুহূর্তের ভিডিও ধারণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার না করার জন্য কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়।

 

অন্যদিকে, সৌদি আরবে হুথিদের এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিসরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত ইয়েমেনের হোদেইদা প্রদেশ, যা মূলত দেশের আমদানি ও ত্রাণ সরবরাহের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত, সেখানে এই তীব্র বিমান হামলা চালানো হয়।

 

হুথি বিদ্রোহীদের দাবি অনুযায়ী, জোটের যুদ্ধবিমানগুলো হোদেইদা প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বন্দর এবং জ্বালানি তেল মজুত রাখার স্থাপনাগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ ইয়েমেনের অর্থনীতির জন্য এই স্থাপনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

এই সামরিক আগ্রাসনে সেখানে কর্মরত এবং বসবাসরত সাধারণ মানুষের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে, এই অপ্রত্যাশিত ও ভয়াবহ বিমান হামলার ফলে অন্তত সাতজন নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ওই অঞ্চলের অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

 

হুথি নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং মুখপাত্র আনিস আলসাবাহি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেন।

 

আনিস আলসাবাহির দেওয়া তথ্যমতে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের যুদ্ধবিমানগুলো প্রথমেই লোহিত সাগরের তীরবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস ইসা বন্দরে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করে। এই আকস্মিক হামলায় সেখানে কর্মরত চারজন সাধারণ শ্রমিক ও বেসামরিক নাগরিক মারাত্মকভাবে আহত হন।

 

এরপর আক্রমণকারীরা বাজিল জেলায় অবস্থিত একটি বৃহৎ তেল ও জ্বালানি স্থাপনাকে টার্গেট করে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায়। সেখানেও আরও তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি গুরুতর জখম হন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করে জানান যে, আহতদের সকলের অবস্থাই আশঙ্কাজনক এবং তারা কেউই কোনো সামরিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

 

আনিস আলসাবাহি তার বিবৃতিতে সৌদি আরবের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম অবমাননা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেসামরিক স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বন্দর এবং জ্বালানি তেল মজুত কেন্দ্রে এভাবে বারবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের এক গুরুতর লঙ্ঘন।

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ইয়েমেনের নিরপরাধ বেসামরিক জনগণ এবং দেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য এমন অর্থনৈতিক ও জীবন রক্ষাকারী স্থাপনাগুলোতে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে সৌদি জোট প্রতিনিয়ত যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করে চলেছে।

 

হুথি কর্তৃপক্ষের মতে, সাম্প্রতিক এই হামলা সেই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাপরাধের তালিকায় আরেকটি নতুন ও জঘন্য সংযোজন। তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘকে এই বর্বরোচিত হামলার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

 

ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যকার এই সাম্প্রতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতিতে এক গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হোদেইদা বন্দরের মতো কৌশলগত স্থাপনায় যেকোনো ধরনের হামলা ইয়েমেনের কোটি কোটি অভুক্ত মানুষের জন্য ত্রাণ সরবরাহকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।

 

লোহিত সাগরের এই রুটটি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মূল্যবৃদ্ধির মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে।

 

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হুথি বিদ্রোহীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে, যা সৌদি আরবসহ সমগ্র আরব উপদ্বীপের নিরাপত্তার জন্য এক স্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

পাল্টাপাল্টি এই হামলার চক্র প্রমাণ করে যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি অর্থবহ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমঝোতা।

 

দীর্ঘ প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই ধ্বংসাত্মক সংঘাত প্রমাণ করেছে যে, কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে একটি জাতির প্রতিরোধ স্পৃহাকে অবদমিত করা যায় না। একদিকে হুথি বিদ্রোহীরা যেমন ক্রমাগতভাবে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আক্রমণ চালিয়ে রিয়াদকে চাপের মুখে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করার মাধ্যমে হুথিদের রসদ ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

 

কিন্তু এই ক্ষমতার লড়াইয়ের মাঝখানে সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকাচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ জনগণ। জাতিসংঘের একাধিক প্রতিবেদনে ইয়েমেন পরিস্থিতিকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। দেশটির লাখ লাখ শিশু চরম পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, সুপেয় পানির অভাবে কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ মহামারি আকার ধারণ করেছে।

 

হাসপাতাল, স্কুল এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক অবকাঠামোগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমন একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে রাস ইসা বন্দর বা বাজিল জেলার মতো তেল স্থাপনায় আঘাত হানার অর্থ হলো, বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকু থেকেও ইয়েমেনবাসীকে বঞ্চিত করা।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পাল্টাপাল্টি হামলার চক্র থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো নিঃশর্ত ও কার্যকর কূটনৈতিক সংলাপ। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে শান্তি চুক্তির জন্য যে কয়েকটি প্রাথমিক উদ্যোগ ইতিপূর্বে গ্রহণ করা হয়েছিল, তা বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে বিশ্বাসহীনতা এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে।

 

পরিশেষে, সোমবারের এই পাল্টাপাল্টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান হামলার ঘটনা আবারও বিশ্ব বিবেককে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রান্তিকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কতটা জরুরি। নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত বন্ধ করতে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হলে অবিলম্বে এই সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার কোনো বিকল্প নেই।

 

- আল জাজিরা