শনিবার ফ্লোরিডায় নিজ বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যেকোনো সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক কঠোর ও তাৎক্ষণিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কড়া বার্তা দিয়েছেন।
দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই পাল্টাপাল্টি হুমকি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। শনিবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের অত্যন্ত সুরক্ষিত পারমাণবিক অবকাঠামোগুলোর সিংহভাগই সফলভাবে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে সামরিক অভিযান এখনো পুরোপুরি সমাপ্ত হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইরানের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে এখনো অন্তত একটি বা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান বাকি রয়েছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
নিজের সামরিক সক্ষমতার অহংকার প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, এই অবশিষ্ট স্থানগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিতে তাদের মাত্র দশ মিনিট সময় লাগবে। এই ধ্বংসযজ্ঞ যেকোনো মুহূর্তে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব বলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।
অবশিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলোর বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ‘পিকঅ্যাক্স’ নামক একটি পাহাড়ের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, পাহাড়ের গভীরে থাকা এই স্থাপনাটির দিকে গভীরভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন এবং এর বিরুদ্ধে খুব দ্রুতই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কবে নাগাদ এই সম্ভাব্য আক্রমণটি পরিচালিত হতে পারে বা চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তা ঘটবে কি না, এমন একটি সরাসরি প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করেন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এটি একটি নিতান্তই বোকা প্রশ্ন। যদি তিনি আগামীকালের মধ্যেই এই হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবুও কি তিনি কৌশলগত কারণে সেই গোপনীয় তথ্য সংবাদমাধ্যমের কাছে আগেই ফাঁস করবেন? এই পালটা প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি মূলত মার্কিন আক্রমণ পরিকল্পনার গোপনীয়তা বজায় রাখার বিষয়টিই সুনিশ্চিত করেছেন।
একদিকে যেমন সামরিক আক্রমণের প্রচ্ছন্ন হুমকি অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সাথে তাদের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনাও চলমান রয়েছে। তিনি এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা প্রক্রিয়াকে প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করলেও, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর সন্দেহ পোষণ করেন।
তিনি স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেন, আলোচনা ঠিকঠাকমতো এগোলেও তারা ভালো করেই জানেন যে, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য বা আস্থার যোগ্য নয়। তাদের অতীত কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, তারা যেকোনো মুহূর্তে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই কঠোর মন্তব্যের আগেই ইরানের অভ্যন্তরে এক উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও কৌশলগত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশের শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এটিই ছিল তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। এই বৈঠকে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আসা যেকোনো সামরিক হুমকির অবিলম্বে ও তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার জন্য সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার কঠোর নির্দেশ দেন।
এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি বলেন, শত্রুপক্ষের যেকোনো পর্যায়ের, মাত্রার বা ধরনের হুমকির তাৎক্ষণিক, প্রভাবশালী এবং ভৌগোলিকভাবে সীমাহীন ও বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। অর্থাৎ, আক্রান্ত হলে ইরান কেবল নিজেদের সীমানার ভেতরেই প্রতিরোধ গড়বে না, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শত্রুর বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানতে একচুলও পিছপা হবে না।
সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সামরিক কমান্ডারদের প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশ জারি করে বলেন, ইরানকে অবশ্যই তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা অনতিবিলম্বে হালনাগাদ করতে হবে। এই নতুন লক্ষ্যবস্তুর তালিকার আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের সমস্ত দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদ অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর অর্থ হলো, সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যেকোনো স্থাপনাই আগামী দিনে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ইরানের এই প্রকাশ্য ও আগ্রাসী সামরিক প্রস্তুতি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এক সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করার চূড়ান্ত নির্দেশ দিতে পারেন বলে গভীর গুঞ্জন রয়েছে।
গত সপ্তাহে তিনি নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী খুব শিগগিরই ‘এপিক ফিউরি’ নামক আরেকটি ছোট মাত্রার তবে অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে। এই গুঞ্জনের পালে আরও হাওয়া জুগিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী তিন নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই একটি বড় পরিসরের সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকতে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে আগেই সতর্ক বার্তা পাঠানো হয়েছে।
উদ্ভূত এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার এক আলাদা বিবৃতিতে কড়া সতর্কতা জারি করেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে যে সামরিক অভিযানের প্রয়োজন রয়েছে, তবে তারা যেকোনো মূল্যে তাদের নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে শতভাগ সক্ষম।
তবে একই সঙ্গে তিনি এটিও নিশ্চিত করেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো পর্যন্ত নতুন করে কোনো সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হননি। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর যে রহস্যজনক ও ধ্বংসাত্মক হামলাগুলো সংঘটিত হয়েছে, তার পেছনে সরাসরি তেহরানের ইন্ধন রয়েছে বলে তিনি ইরানকে এককভাবে দায়ী করেন।
বর্তমানের এই যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির শেকড় প্রোথিত রয়েছে চলতি বছরের শুরুর দিকের একটি বড় রাজনৈতিক ও সামরিক হত্যাকাণ্ডের মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যে। গত আঠাশে ফেব্রুয়ারি এক যৌথ মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই মূলত গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের চরম প্রতিশোধ হিসেবে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মারাত্মক ধাক্কা দেয়। পরবর্তীতে এই সংঘাত প্রশমিত করার লক্ষ্যে গত সতেরোই জুন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে এক ঐতিহাসিক চৌদ্দ দফার যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
কিন্তু শান্তির সেই আশা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায়, আটই জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তিটিকে সমাপ্ত ও বাতিল বলে ঘোষণা দেন, যার ফলে পরিস্থিতি পুনরায় গভীর সংঘাতের দিকে মোড় নেয়।
অন্যদিকে, এই জটিল সমীকরণের আরেক প্রধান নিয়ামক ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বর্তমানে বেশ অস্থিতিশীল। গত মঙ্গলবারের সাধারণ নির্বাচনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
তবে অভ্যন্তরীণ এই অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়েও তিনি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে সমূলে উৎখাত করার যে কট্টর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাতে এখনো পুরোপুরি অবিচল রয়েছেন। নেতানিয়াহুর এই অনড় অবস্থান এবং ট্রাম্পের নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি মিলে মধ্যপ্রাচ্য এখন আক্ষরিক অর্থেই এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর অবস্থান করছে।
যেকোনো একটি ছোট স্ফুলিঙ্গ বা দশ মিনিটের একটি অপরিণামদর্শী সামরিক সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলটিকে এক দীর্ঘস্থায়ী সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। যার অনিবার্য নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।