এই আসন্ন সংঘাতের আঁচ যাতে অপ্রত্যাশিতভাবে মিত্র দেশগুলোর ওপর না পড়ে এবং তারা যাতে নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে পারে, সেজন্য ওয়াশিংটন আগেভাগেই মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছে।
মার্কিন প্রশাসন তাদের মিত্র আরব রাষ্ট্রগুলোকে সম্ভাব্য এই হামলার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছে। প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক রোমহর্ষক ও বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মঙ্গলবার এই আসন্ন সামরিক পদক্ষেপের বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে উঠে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নতুন করে এক বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভঙ্গুর সমীকরণকে পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও তীব্রভাবে অনুভূত হবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ওই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আরব মিত্রদের কাছে যে কড়া সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে, সেখানে আসন্ন এই সামরিক অভিযানকে ‘স্বল্পস্থায়ী তবে অত্যন্ত তীব্র ও ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের কৌশলগত উদ্দেশ্য হলো, সংঘাত যেন দীর্ঘমেয়াদি কোনো অন্তহীন যুদ্ধে রূপ না নেয়, তবে প্রথম আঘাতের মাত্রা যেন এতটাই শক্তিশালী ও নিখুঁত হয় যা ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও কৌশলগত মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দিতে সক্ষম।
আরব দেশগুলোকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই বার্তা দেওয়ার মূল কারণ হলো, মার্কিন হামলার পরপরই ইরান যদি স্বভাবসুলভ কোনো প্রতিশোধমূলক পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, তবে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো যেন নিজেদের আকাশসীমা, কৌশলগত স্থাপনা এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।
একই সঙ্গে, মার্কিন সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা তাদের নিজস্ব বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চুলচেরা মূল্যায়ন করছে। পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, সংঘাত শুরু হলে ইরান তার দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানতে পারে।
তাই যেসব স্থানে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার সবচেয়ে সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে, সেসব ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল অবস্থান থেকে সেনাদের অত্যন্ত গোপনীয়তা ও দ্রুততার সঙ্গে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে নিশ্চিত করেছেন।
সম্ভাব্য এই সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল আক্রমণাত্মক কৌশলই গ্রহণ করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র রাষ্ট্র ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র ও অভেদ্য করার জন্যও বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্য থেকে ইসরায়েলে একটি অত্যাধুনিক ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা অ্যাডভান্সড মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে স্থানান্তর করছে মার্কিন সেনাবাহিনী।
এই সর্বাধুনিক প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি সামরিক প্রযুক্তি, যেখানে রয়েছে শত্রুর গতিবিধি শনাক্ত করতে সক্ষম উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাডার যন্ত্রাংশ, একটি স্বয়ংক্রিয় এনগেজমেন্ট কন্ট্রোল স্টেশন, অত্যাধুনিক মিসাইল লঞ্চার এবং শত্রুপক্ষের যেকোনো ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ মিসাইলকে মাঝপথেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম শক্তিশালী প্রতিহতকারী বা ইন্টারসেপ্টর মিসাইল।
ইরানের হাতে থাকা বিশাল ও অত্যাধুনিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার থেকে ইসরায়েলকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার জন্যই মার্কিন সামরিক কমান্ড এই অভূতপূর্ব নিরাপত্তামূলক বলয় তৈরি করছে।
প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক সামরিক প্রস্তুতির বিশালতাও সামরিক বিশ্লেষকদের অবাক করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই মুহূর্তে তাদের যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি করছে।
পূর্ববর্তী বিভিন্ন সামরিক অভিযানে যেসব অত্যাধুনিক অস্ত্র, স্মার্ট বোমা ও গাইডেড গোলাবারুদ ফুরিয়ে এসেছিল, সেগুলো পুনরায় মজুত করার জন্য সামরিক লজিস্টিক বা সরবরাহ ব্যবস্থা দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছে।
অপরদিকে, ইরানি ভূখণ্ডে নির্ভুল ও ধ্বংসাত্মক বোমাবর্ষণের জন্য মার্কিন বিমানবাহিনীর কৌশলগত বোমারু বিমান (বোম্বার) এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছে। শুধু আকাশপথেই নয়, সমুদ্রপথেও যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক প্রস্তুতি এক কথায় নজিরবিহীন।
ইরানের বিরুদ্ধে এই সম্ভাব্য নতুন হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়ার জন্য মার্কিন নৌবাহিনীর একটি বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ ইউনিট এবং বেশ কয়েকটি আধুনিক ও সমরাস্ত্রে সজ্জিত যুদ্ধজাহাজ দ্রুতগতিতে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এই নতুন নৌবহরটি ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর অন্তত ২০টি রণতরী ও এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের বিশাল বহরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আক্রমণাত্মক শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করবে। তবে সামরিক কৌশল ও রণপরিকল্পনার একটি সূক্ষ্ম অংশ হিসেবে চূড়ান্ত হামলার ঠিক আগমুহূর্তে কৌশলগত কারণে কিছু নির্দিষ্ট যুদ্ধজাহাজকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে বলেও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তবে এত সব ব্যাপক সামরিক আয়োজনের পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এই হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত ঠিক কবে আসবে, তা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এই সর্বাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক হামলার ব্যাপারে চূড়ান্ত এবং আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হননি।
তবে হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো এবং বিশেষ করে তাদের বিতর্কিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সরাসরি ও বিধ্বংসী হামলা চালানোর দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর অর্থ হলো তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে দশক পিছিয়ে দেওয়া, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের একটি অন্যতম প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য।
কিন্তু ইরানও এই চরম হুমকির মুখে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়নি। মার্কিনিদের এমন প্রকাশ্য ও ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতির অত্যন্ত কড়া জবাব দিয়ে তেহরান ইতিমধ্যে এক ভয়াবহ পাল্টা হুমকি উচ্চারণ করেছে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়ংকর পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি নতুন করে তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডে বিন্দুমাত্র কোনো ধরনের হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে ইরানও কোনোভাবেই হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
তেহরান তাদের প্রতিশোধমূলক হামলার পরিধি কেবল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা ইসরায়েলি ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে না, বরং এই যুদ্ধের আগুন সমগ্র অঞ্চলে বিস্তৃত করা হবে। ইরান সুস্পষ্টভাবে হুমকি দিয়ে বলেছে যে, তাদের ওপর হামলা হলে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো, তেল শোধনাগার, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে সরাসরি তাদের হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হবে।
ইরানের এই সরাসরি হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি গোটা বিশ্ব অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে বাধ্য, যা বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তা এই অঞ্চলের দেশগুলোর পাশাপাশি সারা বিশ্বের জন্যই এক গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরাশক্তিগুলোর এই পেশিশক্তি প্রদর্শন, পারমাণবিক উত্তেজনা ও সামরিক কূটনীতির এই জটিল দাবা খেলা শেষ পর্যন্ত কোন ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে মোড় নেয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে কেবল সেটাই পর্যবেক্ষণ করছে।