বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া নেতানিয়াহু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম

ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া নেতানিয়াহু
ছবি : File Photo

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি নিদা ইব্রাহিমের পাঠানো এক বিশেষ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে ইসরায়েলের চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার এক মরিয়া চেষ্টার বিষয়টি অত্যন্ত সুচারুভাবে উঠে এসেছে।

 

ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের ভোট গণনার কাজ ইতোমধ্যেই ৭৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এই চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি এসে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঠিক কোন দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে, তা নিয়ে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে গভীর জল্পনা-কল্পনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।

 

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকেও ইসরায়েলের এই নির্বাচনের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে, কারণ নতুন সরকারের নীতির ওপর এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। বর্তমান পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক না কেন, একটি বিষয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট-যেকোনো মূল্যে, দাঁতে দাঁত চেপে এবং সমস্ত রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছেন প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও ধুরন্ধর রাজনীতিক বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

 

বর্তমান ভোট গণনার পরিসংখ্যান ও রাজনৈতিক মেরুকরণের ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মূলত চারটি সম্ভাব্য দৃশ্যপটের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছেন, যা কেবল ইসরায়েলের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং এই অস্থিতিশীল অঞ্চলের সার্বিক ভূ-রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

 

ইসরায়েলের বর্তমান জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রথম দৃশ্যপটটি হলো একটি বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন। এই সম্ভাব্য জোট সরকারে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দল নিজেদের মধ্যকার চরম বিরোধ ভুলে একসাথে যুক্ত হয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারে।

 

ইসরায়েলের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে চরম অস্থিরতা দূর করতে এ ধরনের ঐকমত্যের সরকার গঠনের নজির থাকলেও, বর্তমান বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত জটিল, কঠিন ও সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া।

 

কারণ, এই দুই নেতার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নির্বাচনী প্রচারণায় একে অপরের প্রতি তারা যে তীব্র ও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, তা থেকে হঠাৎ সরে এসে একই মন্ত্রিসভায় বসা উভয়ের জন্যই এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ছাড় দেওয়ার সমতুল্য।

 

তবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা এমন একটি আপসমূলক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন বলে অনেক অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন। যদিও এ ধরনের বিপরীতমুখী সরকার গঠিত হলে তা কতদিন পর্যন্ত টেকসই হবে এবং দলগুলোর সমর্থকরা বিষয়টিকে কীভাবে গ্রহণ করবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকেই যায়।

 

দ্বিতীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যপটটি আবর্তিত হচ্ছে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনি-আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি বিকল্প ও সম্পূর্ণ নতুন ধরনের জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে।

 

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট বা নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর নিরঙ্কুশ সমর্থন আইজেনকোটের জন্য এক বিশাল তুরুপের তাস হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পথটি আইজেনকোটের জন্য মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ বা সহজ নয়।

 

এই ধরনের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করতে হলে তাকে সর্বপ্রথম নিজের রাজনৈতিক শিবিরের অভ্যন্তরীণ মিত্রদের সাথে এক কঠিন বোঝাপড়ায় আসতে হবে। কারণ, তার জোটের দুই কট্টর ডানপন্থী, প্রভাবশালী ও চরম জাতীয়তাবাদী অংশীদার-অ্যাভিগডোর লিবারম্যান এবং নাফতালি বেনেট-ইতোমধ্যেই অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা কোনো অবস্থাতেই আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করবেন না বা এমন কোনো জোটে অংশগ্রহণ করবেন না।

 

লিবারম্যান ও বেনেটের এই চরম অনড় আদর্শিক অবস্থান আইজেনকোটের জন্য এক চরম অস্বস্তিকর ও প্রায় অসম্ভব পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ফলে আরব দলগুলোকে সাথে নিয়ে সরকার গঠনের এই দৃশ্যপটটি বাস্তবে রূপ দেওয়া আইজেনকোটের জন্য পাহাড়সম এক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তৃতীয় সম্ভাব্য দৃশ্যপটটি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, কূটকৌশল ও বিরোধী শিবিরকে দুর্বল করার চতুর হিসাব-নিকাশের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু তার প্রতিপক্ষ গাদি আইজেনকোটের রাজনৈতিক শিবিরে বড় ধরনের ফাটল ধরানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে পারেন।

 

রাজনৈতিক কূটকৌশলে চরম পারদর্শী নেতানিয়াহু খুব ভালো করেই জানেন যে, বিরোধী জোটের ভিত্তি খুব একটা মজবুত নয় এবং সেখানে স্বার্থের ব্যাপক সংঘাত রয়েছে। তাই তিনি আইজেনকোটের জোটের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজনৈতিক নেতা বা ক্ষুদ্র কোনো দলকে প্রলোভন দেখিয়ে নিজের দলে ভেড়ানোর জোর চেষ্টা করতে পারেন।

 

গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বা ক্ষমতার লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে প্রতিপক্ষের শিবির থেকে সমর্থন আদায় করে নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করার এই রাজনৈতিক খেলা নেতানিয়াহুর জন্য একেবারেই নতুন কিছু নয়।

 

যদি তিনি সত্যিই বিরোধী শিবির ভেঙে এমন রাজনৈতিক দলবদল ঘটাতে সক্ষম হন, তবে তা হবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় কৌশলগত বিজয় এবং বিরোধীদের জন্য এক চরম ও অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়।

 

সর্বশেষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক ও ভীতিপ্রদ দৃশ্যপটটি হলো-ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করা। রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু বর্তমানে এমন এক সুবিধাজনক ও আইনি অবস্থানে রয়েছেন, যেখানে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি কার্যত তার হাতেই রয়ে গেছে।

 

যেহেতু তিনি এখনো প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল রয়েছেন এবং নতুন কোনো নির্বাচিত সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে পূর্ণ আইনি, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার চর্চা চালিয়ে যাবেন, তাই এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়টিকে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহার করতে পারেন।

 

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চূড়ান্ত ও শেষ ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে নেতানিয়াহু জাতীয় নিরাপত্তার এক ধোঁয়াশা ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারেন। তিনি জাতির উদ্দেশ্যে দাবি করতে পারেন যে, তাদের চিরশত্রু রাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা অন্য কোনো মারাত্মক নিরাপত্তা হুমকির বিষয়ে তার কাছে অতি গোপনীয় ও গুরুতর গোয়েন্দা তথ্য এসেছে এবং এর ভিত্তিতে ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার্থে ইরানের বিরুদ্ধে অবিলম্বে একটি আগাম সামরিক হামলা পরিচালনা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

 

এ ধরনের একটি যুদ্ধংদেহী, ভীতিকর ও জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করে তিনি অত্যন্ত সহজে দেশে নির্বাচন পরবর্তী স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া বা ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দিতে পারেন।

 

দেশের ভেতরে একটি কৃত্রিম যুদ্ধাবস্থা জারি করার মাধ্যমে নেতানিয়াহু মূলত তার নিজের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও চলমান আইনি জটিলতাগুলো থেকে জনগণের মনোযোগ সম্পূর্ণ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

 

এই ধরনের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত কেবল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেই স্থবির করবে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে এক ভয়াবহ, রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিক এবং সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ এই ধরনের কোনো সামরিক উত্তেজনা বা রাজনৈতিক কূটচালের বিন্দুমাত্র পক্ষপাতী নন।

 

তারা একটি স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে দ্রুত একটি স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর নতুন সরকারের প্রত্যাশা করছেন। সাধারণ ইসরায়েলিরা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন যে, নেতানিয়াহুর এই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার মরিয়া চেষ্টা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কতটা হুমকিস্বরূপ হতে পারে।

 

পরিশেষে, রামাল্লা থেকে পাওয়া এই বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ এক চরম অনিশ্চয়তা ও শ্বাসরুদ্ধকর ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

নির্বাচন শেষে ভোট গণনার চূড়ান্ত ফলাফল আসার আগেই যে ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ক্ষমতার নির্লজ্জ লড়াই শুরু হয়েছে, তা মূলত দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরের গভীর ফাটলগুলোকেই উন্মোচিত করছে।

 

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, যিনি দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন, তিনি যে কোনোভাবেই সহজে ক্ষমতা ছাড়বেন না, তা তার বর্তমান রাজনৈতিক গতিবিধি থেকেই শতভাগ প্রমাণিত হচ্ছে।

 

আগামী দিনগুলোতে এই চার দৃশ্যপটের কোনটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ এবং সমগ্র অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নেতানিয়াহুর এই দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক নতুন ও অনিশ্চিত অধ্যায়ের জন্ম দিতে যাচ্ছে, যা বিশ্ববাসীর জন্য এক গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।

 

- আল জাজিরা