বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ নেতানিয়াহু ও বিরোধীরা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম

ইসরায়েলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ নেতানিয়াহু ও বিরোধীরা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বদা আলোচনায় থাকা রাষ্ট্র ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক গভীর, জটিল ও নজিরবিহীন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত পার্লামেন্ট বা নেসেট নির্বাচনের পর প্রকাশিত বুথফেরত জরিপের সর্বশেষ ফলাফল অনুযায়ী, দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে গঠিত বৃহত্তর বিরোধী দলীয় জোট-কোনো পক্ষই এককভাবে বা নিজস্ব জোটবদ্ধ কাঠামোর মাধ্যমে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না।

 

১২০ আসন বিশিষ্ট ইসরায়েলি পার্লামেন্টে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে হলে যেকোনো দল বা জোটকে কমপক্ষে ৬১টি আসনের জাদুকরী সংখ্যা নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু প্রাথমিক জরিপের তথ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইসরায়েলের চরম বিভক্ত রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কোনো পক্ষই এই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি।

 

এর ফলে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদী এক রাজনৈতিক শূন্যতা, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং চরম সাংবিধানিক সংকটের প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থা মূলত আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ওপর নির্ভরশীল।

 

এই ব্যবস্থার কারণে কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ফলস্বরূপ, দেশটিতে সরকার গঠনের জন্য সমমনা বা বিপরীতমুখী বিভিন্ন ছোট-বড় দলের সমন্বয়ে জোট গঠন করা একটি অপরিহার্য নিয়মে পরিণত হয়েছে।

 

কিন্তু এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি মেরুকৃত। একদিকে রয়েছেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তার কট্টর ডানপন্থী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী মিত্ররা, অন্যদিকে রয়েছে এমন একটি বিরোধী বলয় যাদের একমাত্র রাজনৈতিক সংযোগসূত্র হলো নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার মসনদ থেকে চিরতরে বিদায় করা।

 

এই দুই বিপরীতমুখী মেরুর চরম অনমনীয় অবস্থানের কারণেই মূলত বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে ইসরায়েলি নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণের এক অভাবনীয় চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে।

 

দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নিবন্ধিত ভোটারদের প্রায় ৮০ শতাংশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নিজেদের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। বিগত কয়েকটি সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় ভোটারদের এই উপস্থিতির হার যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ও ইঙ্গিতবহ।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট, বিচারবিভাগীয় সংস্কার নিয়ে সৃষ্ট সামাজিক বিভাজন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরায়েলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মাঝে যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, মূলত তারই প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটেছে ভোটকেন্দ্রগুলোর এই উপচে পড়া ভিড়ে।

 

তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েলের আরব বা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক জাগরণ। প্রথাগতভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি একধরনের হতাশা ও ক্ষোভ থেকে আরব ভোটাররা ভোটদানে কিছুটা অনীহা দেখিয়ে থাকেন।

 

কিন্তু এবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের উপস্থিতির হার অপ্রত্যাশিতভাবে প্রায় ৮০ শতাংশ ছুঁয়েছে, যা ইসরায়েলের নির্বাচনী ইতিহাসে এক বিরল ও যুগান্তকারী ঘটনা। এর আগে ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এই আরব জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ভোট বর্জন করেছিল, যার ফলে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সম্মিলিতভাবে মাত্র ১০টি আসন লাভে সক্ষম হয়েছিল।

 

কিন্তু এবারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আরব ভোটারদের এই ব্যাপক ও ঐক্যবদ্ধ উত্থানের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট, কাঠামোগত এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

 

বিশেষ করে, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারের অত্যন্ত কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের বিতর্কিত, উসকানিমূলক ও পদ্ধতিগত বৈষম্যমূলক নীতি আরবদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ভীতির জন্ম দিয়েছে।

 

পাশাপাশি আরব অধ্যুষিত শহর ও গ্রামগুলোতে লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়া অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও মারাত্মক আন্তঃগোত্রীয় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম ব্যর্থতা আরব সমাজকে গভীরভাবে হতাশ করেছে।

 

এর সাথে যুক্ত হয়েছে কোনো প্রকার আইনি সুরাহা ছাড়াই নির্বিচারে আরবদের শত শত বাড়িঘর ভেঙে ফেলার মতো অত্যন্ত কঠোর ও অমানবিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ। টিকে থাকার এই চরম সংকটের মুখেই সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায়টি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য হয়েছে।

 

বুথফেরত জরিপের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রাথমিক হিসাব বলছে, আরব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো এবারের পার্লামেন্টে নিজেদের অবস্থান অভাবনীয়ভাবে সুসংহত করতে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন নেসেটে তারা সম্মিলিতভাবে ১৮টির মতো আসন লাভ করতে পারে।

 

সংসদীয় পাটিগণিতের সাধারণ হিসাবে এই ১৮টি আসন বর্তমান অচলাবস্থায় যেকোনো জোটের জন্য সরকার গঠনের প্রধান চাবিকাঠি বা ‘কিংমেকার’ হয়ে ওঠার কথা। যদি নেতানিয়াহু বা বিরোধীদের মধ্যে কেউ আরব দলগুলোর সাথে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তবে মুহূর্তের মধ্যেই ক্ষমতার চাকা ঘুরে যেতে পারে।

 

কিন্তু ইসরায়েলের রাজনীতির গভীর আদর্শিক, ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন এই পাটিগণিতের হিসাবকে সম্পূর্ণ অকার্যকর ও অসম্ভব করে দিয়েছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী ও ধর্মীয় ইহুদি রক্ষণশীল জোট এবং তার বিরোধিতায় গঠিত মধ্যপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ জোট-উভয় পক্ষই আরব দলগুলোর প্রকাশ্য বা পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের প্রস্তাবকে সরাসরি ও কঠোর ভাষায় নাকচ করে দিয়েছে।

 

ইসরায়েলের মূলধারার প্রায় সবকটি শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতারাই নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণায় এবং নির্বাচনের পরে ফলাফলের আভাস পাওয়ার সাথে সাথে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তারা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব দলগুলোর সাথে কোনো প্রকার ক্ষমতা ভাগাভাগি বা জোটবদ্ধ সরকার গঠনে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নন।

 

তাদের মতে, আরব দলগুলোর সাথে রাজনৈতিক জোট গঠন তাদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদী ভোটারদের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে। এই তীব্র আদর্শিক অনড় অবস্থান এবং জাতিগত বিভাজন ইসরায়েলকে এক চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে ধাবিত করছে।

 

কোনো পক্ষই যখন সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাচ্ছে না এবং একই সাথে আরব দলগুলোর সমর্থন নিতেও তারা তীব্রভাবে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, তখন একটি কার্যকরী ও স্থিতিশীল সরকার গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন দীর্ঘস্থায়ী, ক্লান্তিকর ও অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক দরকষাকষির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

 

ইসরায়েলের সাংবিধানিক নিয়ম, আইনি কাঠামো ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী, নির্বাচনের প্রতিটি ব্যালট গণনা শেষ হওয়ার পর যখন নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ করবে, তখন দেশের প্রেসিডেন্টের ওপর এক ঐতিহাসিক ও বিশাল দায়িত্ব বর্তাবে।

 

নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট তখন পার্লামেন্টে নবনির্বাচিত প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রধানদের সাথে তার সরকারি বাসভবনে পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও নিবিড় পরামর্শ শুরু করবেন। এই দীর্ঘ আলোচনার মূল লক্ষ্য থাকবে এমন একজন যোগ্য রাজনৈতিক নেতাকে খুঁজে বের করা, যার নেসেটে আস্থা ভোটে জয়ী হওয়ার এবং ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের দলগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে একটি স্থিতিশীল কোয়ালিশন সরকার গঠনের সর্বোচ্চ আইনি ও রাজনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে।

 

প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট বা দায়িত্ব পাওয়ার পর, মনোনীত প্রার্থী অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মন্ত্রণালয় বণ্টন, বাজেট বরাদ্দ, নীতিগত ছাড় এবং আসন সমঝোতার বিষয়ে দরকষাকষির জন্য ২৮ দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পাবেন।

 

যদি তিনি এই সময়ের মধ্যে ব্যর্থ হন, তবে প্রেসিডেন্ট তাকে আরও ১৪ দিনের অতিরিক্ত সময় প্রদান করতে পারেন। কিন্তু বর্তমান বিভক্ত রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বা তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের সামনে বিকল্প পথগুলো অত্যন্ত রুক্ষ, কঠিন এবং সীমাবদ্ধ।

 

দীর্ঘ এই সময়সীমার মধ্যেও যদি মনোনীত কোনো নেতাই শেষ পর্যন্ত ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করে একটি কার্যকরী সরকার গঠনে সফল না হন, তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে দেশটিকে সম্ভবত পুনরায় একটি ব্যয়বহুল, তিক্ত এবং অনিশ্চিত সাধারণ নির্বাচনের দিকেই অগ্রসর হতে হবে।

 

মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোট গণনা শেষ হয়ে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা এবং প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সরকার গঠনের দায়িত্ব অর্পণের পুরো সময়টা জুড়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক শ্বাসরুদ্ধকর ও জটিল টানাপোড়েন অব্যাহত থাকবে, যা কেবল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও প্রশাসনকেই স্থবির করবে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এক সুদূরপ্রসারী ও উদ্বেগজনক প্রভাব ফেলবে।

 

- আল জাজিরা