এবারের এই নির্বাচন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং বিশ্লেষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, তা হলো ইসরায়েলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত আরব বেদুঈন সম্প্রদায়ের অভূতপূর্ব এবং স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ।
দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা এই সম্প্রদায়টি এবার দলে দলে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমান কট্টর ডানপন্থী জোট সরকারের অন্যতম বিতর্কিত মুখ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের চরম বৈষম্যমূলক নীতি এবং কঠোর আচরণের প্রতি তীব্র ক্ষোভ থেকেই মূলত আরব বেদুঈনরা এবার ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে নিজেদের জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেন গভির এবং তার কট্টরপন্থী মতাদর্শকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় নেগেভ মরুভূমি অঞ্চলে বসবাসরত বেদুঈন সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবেই নানাবিধ রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা এবং কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন।
ওই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শহর রাহাতের বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে এইবারের নির্বাচনে তাদের ক্ষোভের মাত্রাটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে রাহাতের বাসিন্দাদের বর্তমান মনোভাব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
শহরটির সাধারণ ভোটাররা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তারা মূলত জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের ওপর চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়েই এবার ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
রাহাতের এক প্রবীণ বাসিন্দা তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেন গভির তার উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং বৈষম্যমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে কার্যত দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত থাকা আরব সম্প্রদায়কে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একতাবদ্ধ হতে বাধ্য করেছেন।
বেন গভিরের গৃহীত কঠোর নীতিগুলোই আজ আরব বেদুঈনদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। ভোটদানের সময় এবং উপস্থিতির হারের ক্ষেত্রেও এবার এক নজিরবিহীন এবং দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ইসরায়েলের বিগত জাতীয় নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণত আরব এবং বেদুঈন অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটদানের হার তুলনামূলকভাবে বেশ কম থাকে এবং যারাও বা ভোট দিতে আসেন, তাদের বেশিরভাগই দিনের শেষ ভাগে বা সন্ধ্যার দিকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন।
কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অভাবনীয়। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইসরায়েল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, রাহাত শহরের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক অংশই আজ সকালের দিকেই নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছেন।
সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রগুলোর বাইরে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং দীর্ঘ লাইন প্রমাণ করে যে, এই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি প্রবল ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে।
এইবারের নির্বাচনের সবচেয়ে চমকপ্রদ, ইতিবাচক এবং অভূতপূর্ব দিকটি হলো বেদুঈন নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত এবং ব্যাপক অংশগ্রহণ। ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে বেদুঈন নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা প্রকাশ্যে ভোটকেন্দ্রে আসার হার অতীত নির্বাচনগুলোতে ছিল একেবারেই নগণ্য।
কিন্তু এবার সেই পুরোনো রীতিনীতি এবং অদৃশ্য সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে বিপুলসংখ্যক আরব বেদুঈন নারী অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ভোট দিতে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন। স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ‘নজিরবিহীন’ এবং একটি যুগান্তকারী সামাজিক পরিবর্তন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিবারের নিরাপত্তা, বাসস্থানের নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদেই নারীরা আজ রাজনৈতিকভাবে এতটা সচেতন হয়ে উঠেছেন এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে এতটা সোচ্চার ভূমিকা পালন করছেন।
আরব বেদুঈনদের এই তীব্র ক্ষোভের পেছনে মূলত দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুতর এবং স্পর্শকাতর আর্থসামাজিক কারণ নিহিত রয়েছে। রাহাত শহরসহ দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য বেদুঈন পল্লীর বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান কট্টর ডানপন্থী সরকার তাদের প্রতি চরম বিমাতৃসুলভ আচরণ করেছে।
বর্তমান সরকারের আমলে বেদুঈন অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বেআইনি আখ্যা দিয়ে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা হাজার হাজার মানুষকে সম্পূর্ণ গৃহহীন এবং মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করেছে।
এছাড়া, আরব অধ্যুষিত শহর ও গ্রামগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া সংঘবদ্ধ অপরাধ, গ্যাং কালচার এবং অবৈধ অস্ত্রের ভয়াবহ সহিংসতা থামাতেও বর্তমান সরকার এবং বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের নেতৃত্বাধীন পুলিশ প্রশাসন চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
প্রতিদিনের এই রক্তপাত এবং নিরাপত্তাহীনতা সাধারণ আরব নাগরিকদের জনজীবনকে চরম দুর্বিষহ করে তুলেছে, যার দায়ভার তারা সরাসরি বর্তমান প্রশাসনের ওপরই চাপাচ্ছেন। শুধু আইনি বা নিরাপত্তা বৈষম্যই নয়, অর্থনৈতিক বঞ্চনাও এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। এ
র আগে ইসরায়েলে যে অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী এবং বহুদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা আরব ও বেদুঈন সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং অবকাঠামোগত উন্নতির জন্য বেশ কিছু বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং বিপুল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করেছিল।
কিন্তু বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং বেন গভিরের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই সেই উন্নয়নমূলক বরাদ্দগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বাতিল করা হয় এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে পুনরায় কোণঠাসা করে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নিজেদের মৌলিক অধিকার থেকে এই চরম বঞ্চনা এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যই আরব বেদুঈনদের বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তারা অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলে এবং নিজেদের জনপ্রতিনিধিদের পার্লামেন্টে না পাঠালে এই রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার কোনো টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
জনমিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই হলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিক। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরব মুসলিম, বেদুঈন সম্প্রদায়, খ্রিস্টান এবং দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও রয়েছেন।
ঐতিহাসিকভাবে এই বিশাল জনগোষ্ঠী যদি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, তবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তারা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নির্ণায়ক বা ‘কিংমেকার’ ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা রাখে।
এবারের নির্বাচনে যদি আরব ও বেদুঈন ভোটারদের এই উচ্চ উপস্থিতির ধারা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তবে তা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং তার কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের জন্য একটি বিশাল রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কারণ, ডানপন্থী জোটের সরকার গঠনের জন্য নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে যে ৬১টি আসনের ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, আরব ভোটারদের এই ব্যালট বিপ্লব সেই সমীকরণকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ২৭ অক্টোবরের এই নেসেট নির্বাচন ইসরায়েলের সংখ্যালঘু আরব এবং বেদুঈনদের জন্য কেবল একটি সাধারণ নির্বাচন নয়, বরং এটি তাদের অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা এবং সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার এক সুদীর্ঘ সংগ্রামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইতামার বেন গভিরের মতো কট্টরপন্থী নেতাদের বিরুদ্ধে তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথকে কোন দিকে ধাবিত করে, এখন সেদিকেই গভীর মনোযোগের সঙ্গে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নীতিই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ার ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে সক্ষম।