মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন

আরব ভোটারদের নজরদারিতে লিকুদ পার্টির বিতর্কিত পদক্ষেপ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

আরব ভোটারদের নজরদারিতে লিকুদ পার্টির বিতর্কিত পদক্ষেপ
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন সব সময়ই আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তবে এবার, দেশটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে এক নতুন ও তীব্র বিতর্কের জন্ম হয়েছে।

 

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দল লিকুদ পার্টি এই নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রগুলোর বাইরে আরব মুসলিম ভোটারদের গতিবিধি ও কার্যকলাপের ভিডিওচিত্র ধারণ করার জন্য বিশেষ নজরদারি দল মোতায়েনের এক অভিনব ও বিতর্কিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

 

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হ্যারেটজ’-এর এক গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তুরস্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি মঙ্গলবার, সাতাশে অক্টোবর এই চাঞ্চল্যকর খবরটি প্রকাশ করেছে।

 

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, আসন্ন নির্বাচনে লিকুদ পার্টি যদি কোনো কারণে তাদের প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয় বা বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, তবে এই ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা নির্বাচনের সার্বিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে এবং ব্যাপক জালিয়াতির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে।

 

‘দ্য হ্যারেটজ’-এর প্রতিবেদনটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, লিকুদ পার্টি ইসরায়েলের আরব অধ্যুষিত এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ, বিশেষ করে লাখ লাখ ইসরায়েলি শেকেল ব্যয় করে একটি নিজস্ব সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী নিয়োগ করেছে।

 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অত্যন্ত গোপনে এবং সুচারুভাবে গঠিত এই বিশেষ দলগুলোর মূল কাজ হবে ভোট দিতে আসা আরব ভোটারদের গতিবিধি রেকর্ড করা এবং সেই সংগৃহীত তথ্য সরাসরি দলীয় সদর দপ্তরে প্রেরণ করা।

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো, সরকারি নির্বাচন কমিশন এবং নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের কঠোর বিধিনিষেধ ও আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য এই দলগুলো ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ না করে, কৌশলগতভাবে কেন্দ্রগুলোর ঠিক বাইরে অবস্থান করে তাদের নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

 

এই পদক্ষেপটি ইসরায়েলের সংখ্যালঘু আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর শঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে, কারণ তারা মনে করছেন যে এটি তাদের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগের পথে একটি সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক বাধা সৃষ্টির অপপ্রয়াস।

 

লিকুদ পার্টির এই পদক্ষেপের নেপথ্যে গভীর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইতোমধ্যেই এমন একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারণা শুরুর বিষয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা করেছেন, যা মূলত দলটি নির্বাচনে বড় ধরনের ব্যবধানে পরাজিত হলে নির্বাচন কারচুপির দাবিকে অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বলয়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, দলের কট্টরপন্থী অংশের কিছু কর্মকর্তা এই বিতর্কিত কৌশলটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করছেন।

 

যদিও নেতানিয়াহু স্বয়ং সরাসরি এ ধরনের কোনো গোপন পরিকল্পনা সভায় উপস্থিত ছিলেন বা আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছেন, এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমের হাতে এসে পৌঁছায়নি, তবে তিনি বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করছেন বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।

 

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় এ ধরনের অভিযোগ বা বিতর্কিত পদক্ষেপ অবশ্য একেবারে নজিরবিহীন নয়। এইবারের নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত লিকুদ পার্টির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ২০২২ সালের ইসরায়েলি সাধারণ নির্বাচনে যে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগগুলো উত্থাপন করা হয়েছিল, তা মূলত বর্তমান নির্বাচনের এই বৃহত্তর ও সুপরিকল্পিত কৌশলের জন্য একটি পরীক্ষামূলক মহড়া বা টেস্ট কেস হিসেবে কাজ করেছে।

 

তার এই মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, লিকুদ পার্টি তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী ও ধারাবাহিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, যেখানে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর অনাস্থা তৈরি করাও তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ারের একটি অংশ।

 

লিকুদ পার্টির দলীয় সূত্রগুলো আরও একটি গুরুতর বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। তাদের মতে, ভোটকেন্দ্রগুলোর বাইরে থেকে গোপনে বা প্রকাশ্যে ধারণ করা এই ভিডিও ফুটেজগুলো নির্বাচনের পর কারচুপির অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে।

 

অথচ আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, এই দলীয় নজরদারি দলগুলোর কোনো ভোটারের পরিচয় যাচাই করার, তাদের বাধা দেওয়ার বা তাদের সম্পর্কে কোনো আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা এখতিয়ার নেই।

 

এই প্রক্রিয়াটিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য লিকুদ পার্টি দেশব্যাপী তাদের নিজস্ব দলীয় পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড এবং অত্যাধুনিক ‘নির্বাচন জালিয়াতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপন করেছে, যা মূলত নির্বাচন কমিশনের সমান্তরাল একটি ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

দুই হাজার তেইশ সালের অক্টোবর মাসে গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নজিরবিহীন ও ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ইসরায়েলে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন। গাজা যুদ্ধ, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এবারের নির্বাচনটি ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম সংবেদনশীল ও মেরুকৃত একটি নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

ঠিক এমন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল সময়ে আরব মুসলিম ভোটারদের টার্গেট করে এ ধরনের নজরদারি এবং নির্বাচন কারচুপির আগাম অভিযোগ উত্থাপনের প্রস্তুতির খবর ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং সার্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

এই নির্বাচনের ফলাফল এবং লিকুদ পার্টির এই বিতর্কিত পদক্ষেপের পরিণতি ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কতটা গভীর প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সারা বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তুমুল জল্পনা-কল্পনা চলছে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি