পশ্চিমা আধিপত্যবাদী পরাশক্তি এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের অব্যাহত চাপ ও হুমকির মুখেও ইরানি জনগণ এবং সামরিক বাহিনীর এই অটল ও দৃঢ় অবস্থান বিশ্বমঞ্চে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ীর জ্যেষ্ঠ সামরিক সহকারী ও অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা মেজর জেনারেল সাইয়্যেদ ইয়াহিয়া সাফাভি এক বিশেষ আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে দেশের সামরিক সক্ষমতা, জাতীয় প্রতিরোধের ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে তাদের আপসহীন লড়াইয়ের অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো চিত্র তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এবং ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, তার এই বক্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর প্রতি একটি কঠোর সামরিক ও রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
মেজর জেনারেল সাইয়্যেদ ইয়াহিয়া সাফাভি তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আধিপত্যবাদী পশ্চিমা শক্তিগুলো দীর্ঘকাল ধরেই ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করে আসছিল।
শত্রুদের একটি ভুল ধারণা ছিল যে, বহুমুখী সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানকে পরাজিত করে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইরানি জনগণের ইস্পাতকঠিন মানসিক দৃঢ়তা এবং দেশপ্রেমের কারণে শত্রুদের সেই ষড়যন্ত্র ও হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বর্তমানে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী, যার মধ্যে রয়েছে তাদের চৌকস সেনাবাহিনী, রেভল্যুশনারি গার্ডস এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা শাখা, সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং নিজেদের সর্বোচ্চ সামরিক শক্তিমত্তার এক অনন্য শিখরে অবস্থান করছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিক বাহিনী যেকোনো ধরনের আগ্রাসন মোকাবিলা করতে এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সক্ষম। ইরানের সামরিক মতাদর্শ এবং জাতীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের অবদানের কথা অত্যন্ত আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা।
তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, ইরানের অস্তিত্ব এবং আজকের এই স্বাধীন অবস্থানের মূল ভিত্তিই হলেন দেশের অগণিত শহীদ। তার মতে, দেশপ্রেমিক এই শহীদরা যদি নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে মাতৃভূমিকে রক্ষা না করতেন, তবে আজকের বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম ইরানের অস্তিত্ব হয়তো হুমকির মুখে পড়ত।
সাম্প্রতিক সময়ের নানা সংঘাত এবং সামরিক উত্তেজনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের শহীদরাও আন্তর্জাতিক দুই মহাশক্তি ও চরম অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়িয়েছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রতি কঠোর ভাষায় বিষোদগার করেন।
তাদেরকে 'উন্মাদ' ও 'অপরাধী' হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, এই ধরনের চরম আগ্রাসী ও মানবতাবিরোধী শক্তির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ইরানের বীর সন্তানরা নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে মাতৃভূমির সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের বর্তমান সামরিক অবস্থান এবং তাদের প্রভাবের বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মেজর জেনারেল সাফাভি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার অবতারণা করেন। তিনি জানান, পশ্চিমা বিশ্বের একটি দেশের কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক সম্প্রতি ইরান সফরে এসে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।
তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর মতো দুটি চরম আগ্রাসী পরাশক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এবং প্রত্যক্ষভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর মতো রাজনৈতিক ও সামরিক সাহস এককভাবে একমাত্র ইরানেরই রয়েছে।
পারমাণবিক শক্তিধর এই দুই বৈরী পক্ষের বিরুদ্ধে অন্য কোনো দেশের এমন শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলার নজির বর্তমান বিশ্বে বিরল। মেজর জেনারেল সাফাভি পশ্চিমাদের এই স্বীকারোক্তিকে ইরানের জাতীয় শক্তির একটি বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এবং তাদের সামরিক নীতিনির্ধারকরাও এখন খুব ভালোভাবে জানেন যে, ইরান সামরিক দিক থেকে পূর্ণ শক্তি অর্জন করেছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তারা শতভাগ প্রস্তুত।
সামরিক শক্তির পাশাপাশি জলসীমায় ইরানের আধিপত্য এবং নৌবাহিনীর অপরিসীম অবদানের বিষয়টিও সাম্প্রতিক এই সামরিক আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নৌবাহিনীর সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
তিনি বিশেষ করে ঐতিহাসিক ‘রমজান যুদ্ধের’ সময় ইরানের নৌবাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, অসীম সাহসিকতা এবং নিষ্ঠার কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। ওই যুদ্ধে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নৌবাহিনীর সদস্যরা যেভাবে নিজেদের জীবন বাজি রেখে দেশের জলসীমা সুরক্ষিত রেখেছিলেন, তা ইরানের সামরিক ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায় হয়ে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানের নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং কৌশলগত উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি বলেন, ইরানের নৌবাহিনীর সাহসী ও দক্ষ সদস্যরা এখন আর কেবল নিজেদের উপকূলীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নন।
আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিভিন্ন সামুদ্রিক এলাকা, যেমন পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর এবং হরমোজ প্রণালির মতো কৌশলগত জলপথগুলোতে তারা অত্যন্ত কার্যকর এবং দায়িত্বশীল উপস্থিতি বজায় রেখে চলেছেন।
এর মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন নিজেদের বিশাল জলসীমার নিরবচ্ছিন্ন সুরক্ষা নিশ্চিত করছেন, অন্যদিকে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক নৌপথে নিজেদের সামরিক শক্তির এক বিরাট ভারসাম্যও বজায় রাখছেন।
পরিশেষে বলা যায়, সামরিক দিক থেকে ইরানের এই আত্মবিশ্বাস এবং শীর্ষ কমান্ডারদের এমন জোরালো বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির নানা বাধা সত্ত্বেও ইরান যে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অপ্রতিরোধ্য মাত্রায় উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে, তা এই বক্তব্যগুলোর মধ্য দিয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
ইরানের এই সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতি এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের অটল প্রতিরোধের নীতি আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাব-নিকাশে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।