ইসরাইলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা ‘ব্যাংক অব ইসরাইল’ নামে পরিচিত, অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরোপিত কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কেবল ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহারের মাধ্যমে এড়ানো কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত বা সম্ভব নয়।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এহেন প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান কঠোর হয়েছে, অন্যদিকে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও সরকারের এই নীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক সুস্পষ্ট ও গভীর বিভাজন উন্মোচিত হয়েছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য এক বড় অশনিসংকেত।
ঘটনার সূত্রপাত হয় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারের পর। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি ইসরাইলের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরাইলের নানা পদক্ষেপের কারণে পশ্চিমা বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কঠোর অর্থনৈতিক বা ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা নেমে আসার একটি প্রচ্ছন্ন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে নেতানিয়াহু একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তিনি প্রস্তাব করেন যে, যদি প্রথাগত বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইসরাইলের জন্য সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার ব্যাপক ব্যবহারের জন্য এখন থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন।
মূলত বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা, সুইফট পেমেন্ট নেটওয়ার্ক বা আন্তর্জাতিক ডলারে লেনদেনের ওপর কোনো ধরনের অবরোধ এলে রাষ্ট্রকাঠামো সচল রাখতেই তিনি এই চিন্তার কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। তার মতে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যেকোনো সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অবরোধ মোকাবিলার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি থাকা অত্যাবশ্যক।
প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্বেগের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। নেতানিয়াহু খোলাখুলিভাবেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প সরে যান বা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে, তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইসরাইলকে দেওয়া বিপুল পরিমাণ সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার ধারা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
ঐতিহ্যগতভাবে ইসরাইলের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তাই এই অটুট সমর্থন যদি কোনো কারণে বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ে, তবে দেশটিকে এক গভীর অস্তিত্বের সংকটে পড়তে হবে।
এই শূন্যতা পূরণের বিকল্প পথ খুঁজতেই তিনি প্রথাগত আর্থিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিকেন্দ্রীকৃত ডিজিটাল মুদ্রার ওপর নির্ভর করার ধারণার অবতারণা করেন। একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন বিকল্প চিন্তাধারা আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
তবে নেতানিয়াহুর এই বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শনের কড়া জবাব দিতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করেনি ব্যাংক অব ইসরাইল। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণের সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত এই সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানটি একটি জরুরি বার্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও বিপজ্জনক বলে নাকচ করে দেয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, বর্তমান আধুনিক ও গভীরভাবে সংযুক্ত বিশ্বায়নের যুগে কোনো উন্নত অর্থনীতির দেশের পক্ষেই আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু ডিজিটাল মুদ্রার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে হয়তো কিছু গোপন বা ক্ষুদ্র পরিসরে লেনদেন করা যায়, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের আমদানি-রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রার বিপুল রিজার্ভ পরিচালনা এবং জাতীয় ঋণ পরিশোধের মতো বিশালাকার সামষ্টিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য এটি কখনোই কোনো বৈধ বা কার্যকর উপায় হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সবসময় একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং সর্বজনস্বীকৃত ব্যাংকিং কাঠামোর ওপর নির্ভর করে, যা কোনোভাবেই বেনামি ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা অসম্ভব। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও স্পষ্ট করেছে যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুতর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করার পদ্ধতি এটি নয়।
বিকল্প মুদ্রার পেছনে বা চোরাপথে লেনদেনের উপায় না খুঁজে, সরকারের উচিত বৈশ্বিক বাজার ও মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা। ব্যাংক অব ইসরাইলের মতে, দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে না দেওয়া, যার কারণে ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়াকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের অর্থনীতির জন্য একটি চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ, এ ধরনের যেকোনো পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে ইসরাইলের আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর সন্দেহের জন্ম দেবে।
বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো সংস্থাগুলো তখন ইসরাইলকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের মূল অর্থনীতিকেই পঙ্গু করে দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্য এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া প্রতিক্রিয়ার পরপরই ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা সরকারের এই চিন্তাধারাকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন ও রাষ্ট্রবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইসরাইলের প্রধান বিরোধী নেতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ এবং আরেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইয়োভ হোরোউইৎস নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
এক যৌথ ও কঠোর বার্তায় তারা সতর্ক করে বলেছেন যে, একটি গণতান্ত্রিক ও উন্নত দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখে নিষেধাজ্ঞা ঠেকানোর কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে, বিকল্প বা গোপন ব্যবস্থার বাহানা তৈরি করার কথা একেবারেই মানানসই নয়।
তারা মনে করেন, এ ধরনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা পাঠায় যে, সরকার হয়তো জেনেশুনেই এমন কিছু করতে যাচ্ছে যার জন্য নিষেধাজ্ঞা অবধারিত। একটি রাষ্ট্র যখন আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর চোরাপথ খুঁজতে শুরু করে, তখন তার আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
বিরোধী নেতাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং মূলধনের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। তারা সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, সরকারের এই ধরনের অপরিণামদর্শী চিন্তাধারার ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা চরম আস্থার সংকটে ভুগবেন।
আধুনিক ইসরাইলের অর্থনীতি মূলত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে উচ্চপ্রযুক্তি বা হাই-টেক শিল্প এবং সামরিক উদ্ভাবনের ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। যখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা শুনবেন যে দেশের প্রধানমন্ত্রী খোদ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা করছেন এবং তা এড়াতে মূলধারার ব্যাংকিং ছেড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো অস্থিতিশীল মুদ্রার আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবছেন, তখন তারা নিজেদের মূলধন সুরক্ষিত রাখতে ইসরাইল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নিতে শুরু করবেন।
অর্থনীতিবিদদের পরিভাষায় যাকে 'ক্যাপিটাল ফ্লাইট' বা মূলধন পাচার বলা হয়, তার এক ভয়াবহ রূপ দেখতে হতে পারে দেশটিকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ইসরাইলি মুদ্রার মান মারাত্মকভাবে পড়ে যাবে, অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি আকাশছোঁয়া হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কল্পনাতীতভাবে বৃদ্ধি পাবে।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের এই বিতর্কিত প্রস্তাবটি ইসরাইলের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার একটি অত্যন্ত খণ্ডিত চিত্র মাত্র। এটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক মহলে দেশের বর্তমান ভাবমূর্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মিত্রদের ওপর নির্ভরতা নিয়ে খোদ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এক ধরনের গভীর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
তবে একটি আধুনিক ও উন্নত দেশের অর্থনীতি কোনো ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা বিকল্প অর্থনৈতিক তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে চলতে পারে না। ব্যাংক অব ইসরাইল এবং বিরোধী দলগুলোর এই কঠোর অবস্থান মূলত দেশের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার একটি সম্মিলিত ও সময়োপযোগী প্রয়াস।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের হারানো গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা অব্যাহত রাখতে হলে ইসরাইলকে অবশ্যই প্রথাগত বৈশ্বিক নিয়মকানুন ও দায়িত্বশীল কূটনীতির পথেই হাঁটতে হবে। এর বাইরে গিয়ে কোনো কাল্পনিক বিকল্প মুদ্রার গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলে তা দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক অপূরণীয় ও ঐতিহাসিক ক্ষতি ডেকে আনবে।