রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানে ট্রাম্পের ‘অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের’ কড়া সমালোচনা ওবামার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

ইরানে ট্রাম্পের ‘অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের’ কড়া সমালোচনা ওবামার
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। নির্বাচনী প্রচারণার এই চূড়ান্ত, সংবেদনশীল এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্ব, তার প্রশাসনের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে গৃহীত বিতর্কিত সামরিক পদক্ষেপগুলোর তীব্র ও প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

 

ওহিও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডে আয়োজিত ডেমোক্রেটিক পার্টির এক বিশাল ও জনবহুল নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া এক আবেগপূর্ণ ভাষণে ওবামা বর্তমান রিপাবলিকান প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন হঠকারী সিদ্ধান্তের কড়া নিন্দা জানান।

 

বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতকে তিনি একটি সম্পূর্ণ ‘অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে যখন চরম ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানামুখী মেরুকরণ বিরাজ করছে, ঠিক তখন একজন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন প্রকাশ্য, তীক্ষ্ণ ও সরাসরি সমালোচনা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

বারাক ওবামার মতে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিজের সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে গিয়ে এবং শক্তি প্রদর্শনের মোহে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক গভীর ও অনিশ্চিত খাদের দিকে ঠেলে দিয়েছেন, যার কোনো যৌক্তিকতা বা প্রয়োজনীয়তা কোনো দিক থেকেই ছিল না।

 

ক্লিভল্যান্ডের ওই নির্বাচনী জনসভায় হাজারো সমর্থকের সামনে দাঁড়িয়ে বারাক ওবামা অত্যন্ত যুক্তিখণ্ডিত ও সুশৃঙ্খল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি তার স্বভাবসুলভ বাগ্মিতার মাধ্যমে ভোটারদের সামনে বর্তমান প্রশাসনের ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে এমন কিছু ভুল ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশটির ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।

 

ওবামার সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিতে, এই অসংখ্য ভুলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ, ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত হলো মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরানের মাটিতে নতুন করে সামরিক সংঘাতের সূচনা করা। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ও দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এমন একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে, যার জন্য খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ, করদাতা, সামরিক বাহিনী বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো পক্ষ থেকেই বিন্দুমাত্র দাবি বা যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা ছিল না।

 

সাবেক এই ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টের মতে, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে যে স্পর্শকাতর সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান করা সম্ভব ছিল, সেখানে গায়ের জোরে একতরফা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতিকে কেবল আরও জটিল, উত্তপ্ত ও বিপজ্জনক করে তোলা হয়েছে।

 

তিনি মনে করেন, এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত শুধু মার্কিন সেনাদের মূল্যবান জীবনকেই অকারণে ঝুঁকির মুখে ফেলছে না, বরং বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও এক চরম অস্বস্তিকর ও অনিরাপদ অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং এর সাম্প্রতিক ঘটনাবলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এই সুগভীর উদ্বেগের একটি অত্যন্ত বাস্তব ও অকাট্য ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়।

 

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সামরিক, পারমাণবিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে যে আকস্মিক ও বড় ধরনের সামরিক হামলা চালিয়েছে, তা গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে একেবারে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।

 

এই নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসনের সরাসরি এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করে দেওয়ার মতো চরম কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ বিশ্ববাজারে সরবরাহকৃত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের এক বিশাল অংশ প্রতিদিন এই অত্যন্ত সংকীর্ণ ও স্পর্শকাতর জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়ে থাকে।

 

ইরানের এই আকস্মিক নৌ-অবরোধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় এক অভাবনীয়, আকস্মিক ও মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার এই ঘটনার অনিবার্য ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যে তীব্র, লাগামহীন ও অস্থিতিশীল ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

 

সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় এবং শিপিং কোম্পানিগুলোর বীমা খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে, যার ফলে উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল-সব দেশের অর্থনীতিতেই এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

 

শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, এই যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যাপী পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যসহ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়ে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ ও অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির দিকে ধাবিত করবে।

 

সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ওপর এই দূরবর্তী যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে, সেটিই মূলত ওবামা তার বক্তব্যে দেশের সাধারণ নাগরিকদের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

অন্যদিকে, বারাক ওবামার এই তীক্ষ্ণ, তথ্যনির্ভর ও প্রকাশ্য সমালোচনার পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বভাবতই নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হননি। তিনি তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক অত্যন্ত কড়া, আক্রমণাত্মক ও দীর্ঘ বার্তার মাধ্যমে ওবামার বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

 

ট্রাম্প তার চিরচেনা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের একজন ‘অত্যন্ত অযোগ্য প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ট্রাম্প অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান এই বিস্ফোরক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য তার বর্তমান প্রশাসন কোনোভাবেই দায়ী নয়, বরং ওবামা প্রশাসনের আমলের দুর্বল, নতজানু ও আপসকারী পররাষ্ট্রনীতিই আজকের এই সংকটের প্রধান কারণ।

 

এই প্রসঙ্গে তিনি ২০১৫ সালে ইরান এবং বিশ্বের ক্ষমতাধর ছয়টি রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সেই বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত পারমাণবিক চুক্তির (জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন) কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, ওবামা প্রশাসন তাদের মেয়াদে সেই চুক্তির আড়ালে ইরানকে কয়েক বিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ দিয়ে কার্যত তুষ্ট করার চেষ্টা করেছিল। ট্রাম্পের মতে, ওবামার সেই তথাকথিত দুর্বল কূটনীতি ও বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগানই মূলত তেহরানকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করেছে, তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের গোপন পথকে আরও সুগম করে দিয়েছে।

 

ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, অতীতের সেই ঐতিহাসিক ভুলের মাশুলই আজ বিশ্বকে গুনতে হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বারাক ওবামার মধ্যকার এই তীব্র বাক্যবাণ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আসন্ন মার্কিন নির্বাচনের আগে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চরম মেরুকরণকেই অত্যন্ত নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

 

আগামী ৩ নভেম্বরের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদল বা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াই নয়, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

 

একদিকে ডেমোক্র্যাটরা বর্তমান প্রশাসনের একতরফা, আগ্রাসী এবং অতিমাত্রায় সামরিক হস্তক্ষেপমূলক পররাষ্ট্রনীতিকে বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে ভোটারদের সামনে তুলে ধরছে।

 

অন্যদিকে রিপাবলিকান শিবির অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখতে এবং মিত্রদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের কঠোর, আপসহীন ও ‘শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তি’ নীতির কোনো বিকল্প নেই।

 

সাধারণ মার্কিন ভোটাররা এখন এক চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। তারা কোন পথে হাঁটবেন, তার চূড়ান্ত ফয়সালা হবে আগামী নভেম্বরের ব্যালট বাক্সে। তবে এই রাজনৈতিক রেষারেষি ও ক্ষমতার অশুভ লড়াইয়ের মাঝে পড়ে গোটা বিশ্ব যে এক গভীর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের দিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ধাবিত হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।