আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সামরিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করেছে। এই সংবাদ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার গভীর আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে একটি স্ফুলিঙ্গ পুরো অঞ্চলকে এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা ও সামরিক সূত্রের তথ্যানুযায়ী, সম্ভাব্য এই ব্যাপক মাত্রার অভিযান সফলভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সকল সামরিক সরঞ্জাম, যুদ্ধবিমান, নৌবহর ও সৈন্য ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে মোতায়েন সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
সামরিক বাহিনীর এই প্রস্তুতি কোনো সাধারণ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট আঘাত হানার পূর্বপ্রস্তুতি। এবারের সম্ভাব্য হামলা যদি সত্যিই সংঘটিত হয়, তবে তা অতীতের মতো কেবল সামরিক স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
পূর্বে সাধারণত ইরানের রাডার ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র এবং নির্দিষ্ট কিছু সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতো। কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তথা জ্বালানি অবকাঠামো এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক কেন্দ্রসমূহ।
এই ধরনের স্থাপনায় হামলা হলে তা কেবল ইরানের সামরিক সক্ষমতাকেই পঙ্গু করবে না, বরং দেশটির অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এটি কোনো সীমিত বা প্রতীকী আক্রমণ হবে না, বরং এটি হবে একটি অত্যন্ত বড় ধরনের ও বিধ্বংসী সামরিক অভিযান।
সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার গভীর মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সামরিক অভিযানের অনুমোদন শেষ পর্যন্ত দেবেন কি না, এখন আর সেটি মূল প্রশ্ন নয়।
বরং তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগের বিষয় হলো, তিনি ঠিক কবে বা কখন এই চূড়ান্ত নির্দেশটি প্রদান করবেন। তাদের ধারণা ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই এই সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ আসতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণের কথা মাথায় রেখে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই এই হামলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি প্রবল।
তবে এই সম্ভাব্য অভিযানের পথে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ কিছু জটিল ও কঠিন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, ইরানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকৌশল, আক্রমণের ধরন এবং সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অবগত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান তাদের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলোকে প্রথম আঘাতেই পুরোপুরি ধ্বংস করা বা নিস্ক্রিয় করা মার্কিন বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
তা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এবং প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর একটি দীর্ঘ তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে নির্দেশ আসামাত্রই নিখুঁতভাবে আঘাত হানা সম্ভব হয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এই হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হননি। তবে তার প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, তিনি শেষ পর্যন্ত একটি বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের দিকেই ঝুঁকে রয়েছেন।
যদিও তার অতীত রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই তিনি অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন, কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে কোনো অজানা কারণে বা ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
এই অপ্রত্যাশিত আচরণই বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বেশি অনিশ্চিত ও রহস্যময় করে তুলেছে। এদিকে, সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অত্যন্ত গোপন ও সংবেদনশীল মূল্যায়ন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র রাষ্ট্র ইসরাইল যদি যৌথভাবে বা এককভাবে নতুন করে কোনো হামলা চালায়, তবে ইরান এবং ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা চুপ করে বসে থাকবে না।
তারা অবশ্যই এর চরম ও বিধ্বংসী পাল্টা জবাব দেবে। এই পাল্টা আঘাত কেবল ইসরাইল বা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সেনা ঘাঁটিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অন্যান্য অঞ্চলেও মার্কিন স্বার্থ ও স্থাপনাগুলোতে ভয়াবহ হামলার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইরান ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর অন্তত কয়েকটি দেশে মার্কিন স্থাপনায় হামলার গোপন পরিকল্পনা অত্যন্ত উন্নত ও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সম্ভাব্য সংঘাত ও ক্রমবর্ধমান চরম উত্তেজনা মোকাবিলার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো থেকে নিজেদের কর্মী ও কূটনীতিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপক প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
একটি সতর্কতামূলক ও পূর্বপ্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের দ্রুত সেই দেশ ত্যাগের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিচ্ছে যে, রিয়াদের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতেও খুব শিগগিরই একই ধরনের জরুরি নির্দেশ আসতে পারে।
এর পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নতুন করে যে সকল মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক কর্মী পাঠানোর কথা ছিল, যাদের উপস্থিতি এই মুহূর্তে একেবারে অপরিহার্য নয়, তাদের মোতায়েনও আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
এই সমস্ত পদক্ষেপ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র একটি সম্ভাব্য বৃহৎ যুদ্ধের জন্য নিজেদের সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত রাখছে এবং যেকোনো মূল্যে নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, কখন ওয়াশিংটন থেকে চূড়ান্ত নির্দেশ আসে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে নতুন করে সংঘাতের দাবানল জ্বলে ওঠে।