আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের এই নির্বাচন কেবল একটি সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা বা রুটিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে যুদ্ধাপরাধ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জোট সরকারের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন এবং নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এবারের এই ভোটগ্রহণ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেও একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।
ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থা এবং সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াটি ঐতিহাসিকভাবেই বেশ জটিল ও সমীকরণনির্ভর। দেশটির এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বা নেসেটের সর্বমোট আসন সংখ্যা ১২০টি।
যেকোনো রাজনৈতিক দল বা জোটকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নির্বিঘ্নে সরকার গঠন করতে হলে এই ১২০টি আসনের মধ্যে এককভাবে অন্তত ৬১টি আসনে জয়লাভ করতে হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ অবধি তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে এককভাবে এই ৬১টি আসন পাওয়ার মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কোনো নজির নেই।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে প্রতিটি দল তাদের প্রাপ্ত মোট ভোটের শতকরা হারের ভিত্তিতে আসন পেয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে, প্রতিটি নির্বাচনের পরই সরকার গঠনের জন্য ছোট-বড় বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করা ইসরায়েলি রাজনীতির একটি অপরিহার্য ও অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল ও ডানপন্থি লিকুদ পার্টিও তাদের পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। যার কারণে ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং সরকার গঠন করতে তাকে বাধ্য হয়ে চরম উগ্রপন্থি, কট্টর ডানপন্থি ও কট্টর জাতীয়তাবাদী ছোট ছোট দলগুলোর সঙ্গে আপস করে জোট গঠন করতে হয়েছিল।
এবারের নির্বাচনের চিত্র অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি নাটকীয়, উত্তেজনাপূর্ণ ও অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভোটগ্রহণের ঠিক আগে গত শুক্রবার যে সর্বশেষ নির্বাচনী জনমত জরিপ প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট এবং প্রধান বিরোধী জোটের মধ্যে আক্ষরিক অর্থেই এক অভূতপূর্ব ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে।
এই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পেছনে অন্যতম একটি প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে নতুন ও তরুণ ভোটারদের বিশাল উপস্থিতি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন প্রায় পাঁচ লক্ষ তরুণ ইসরায়েলি নাগরিক।
আধুনিক রাজনীতি সচেতন এই বিশাল তরুণ প্রজন্মের ভোট যেদিকে যাবে, নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল সেদিকেই হেলে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলকে অবাক করে দেওয়া আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, শুধুমাত্র নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে এবং দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় সত্তর হাজার প্রবাসী ইসরায়েলি নাগরিক দেশে ফিরে এসেছেন।
নতুন ও প্রবাসী ভোটারদের এই অভূতপূর্ব উপস্থিতি এবারের নির্বাচনের সমীকরণকে আরও বেশি জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে। নির্বাচনী ময়দানে এবার বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রধান ও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোত।
সামরিক বাহিনীতে তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে তার আপসহীন ভাবমূর্তি সাধারণ ভোটারদের মাঝে তাকে একটি অত্যন্ত শক্ত ও নির্ভরযোগ্য অবস্থানে নিয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, গাদি আইজেনকোতের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থি জোট সম্ভবত নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির জোটের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি আসন লাভ করতে সক্ষম হবে।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক গভীর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্প্রতি পরিচালিত এক নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপে এমন স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, গাদি আইজেনকোতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট নেসেটে অন্তত ৫২টি আসন নিশ্চিত করতে পারে।
অপরদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন উগ্র ডানপন্থি জোট পেতে পারে ৫০টির মতো আসন। তবে ইসরায়েলের অত্যন্ত জটিল সংসদীয় সমীকরণে গাদি আইজেনকোত এককভাবে বেশি আসন পেলেও সেটি নেতানিয়াহুর চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত করে না।
কারণ, সরকার গঠনের সেই কাঙ্ক্ষিত ম্যাজিক ফিগার ‘৬১’ স্পর্শ করতে হলে উভয় জোটকেই অন্যান্য ছোট দলের মুখাপেক্ষী হতে হবে। ফলে নেতানিয়াহু নির্বাচনে তুলনামূলক কম আসন পেলেও অতীতের মতো পর্দার আড়ালের রাজনৈতিক দরকষাকষির মাধ্যমে উগ্রপন্থি ও কট্টর দলগুলোর সমর্থন আদায় করে আবারও প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার সুযোগ তার সামনে উন্মুক্তই থাকছে।
একইভাবে, সমমনা দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠন করে আইজেনকোতও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন। নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোতের এই রাজনৈতিক স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ের মাঝে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড বা ক্ষমতার চাবিকাঠি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দখলদার ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই হলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক, যারা ঐতিহাসিকভাবে নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন।
তাদের রাজনৈতিক অধিকার, আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও মূল দাবির প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতিতে ‘জয়েন্ট লিস্ট’ এবং ‘রা’ম’ নামের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী আরব রাজনৈতিক দল রয়েছে।
রাজনৈতিক পণ্ডিতদের ধারণা, এই বিশাল আরব জনগোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ ভোটে দল দুটি আসন্ন নির্বাচনে সম্মিলিতভাবে অন্তত ১৩টি নেসেট আসনে জয়লাভ করতে পারে। নির্বাচনের এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সমীকরণে এই ১৩টি আসন যেকোনো পক্ষের জন্যই সরকার গঠন বা পতনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর এই নির্ণায়ক অবস্থান একেবারেই নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে ২০২১ সালের সাধারণ নির্বাচনে মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন আরব দল ‘রা’ম’ এক অভাবনীয় ও দুঃসাহসিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।
তারা সেই সময়কার প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি ও রাজনৈতিক জোট গঠন করে তাকে সরকার গঠনে সরাসরি সহায়তা প্রদান করেছিল। ইসরায়েলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম ও একমাত্র ঘটনা, যেখানে ফিলিস্তিনি আরবদের কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি ইসরায়েলি কোয়ালিশন সরকারের অংশীদার হয়েছিল।
সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের নির্বাচনেও রা’ম দলের প্রধান মনসুর আব্বাস একটি অত্যন্ত সাহসী ও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, যুদ্ধাপরাধ ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য প্রধান বিরোধী জোটের যদি অতিরিক্ত আসনের প্রয়োজন হয়, তবে তিনি এবং তার দল নিঃশর্তভাবে তাদের সমর্থন ও সহায়তা প্রদান করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন।
সব মিলিয়ে আগামী মঙ্গলবারের এই সাধারণ নির্বাচন ইসরায়েলের জন্য একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ ও যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু চাইছেন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবং উগ্র ডানপন্থি মিত্রদের কাঁধে ভর করে পুনরায় ক্ষমতার মসনদ সুরক্ষিত করতে, যাতে করে তিনি তার বিরুদ্ধে চলমান আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।
অন্যদিকে গাদি আইজেনকোতের নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী শিবির এবং ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি দলগুলো একজোট হয়ে চাইছে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে ইসরায়েলি রাজনীতিতে একটি নতুন, স্থিতিশীল ও ভিন্নমুখী অধ্যায়ের সূচনা করতে।
বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, প্রবাস থেকে উড়ে আসা নাগরিকদের ভোটদানের গভীর আগ্রহ এবং সর্বোপরি আরব দলগুলোর কিংমেকার বা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা-সবকিছু মিলিয়ে নেসেটের এই নির্বাচন কেবল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়া ও বিশ্বরাজনীতির সমীকরণের জন্য এক চরম কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন কেবল অপেক্ষার পালা, ভোটের ব্যালটে ইসরায়েলের জনগণ কাকে তাদের পরবর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে বেছে নেয় এবং নেতানিয়াহুর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি অপেক্ষা করছে।