চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার পর আইজেনকোট এখন রাজনৈতিক মঞ্চে নতুন পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। উভয় নেতাই ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত।
তাদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইসরায়েলের আগামী দিনের রাজনৈতিক রূপরেখা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ছয়ষট্টি বছর বয়সী গাদি আইজেনকোট ২০২৫ সালে ‘ইয়াসার’ নামক একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং সেই দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি এইবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার মূল প্রতিশ্রুতি হলো ইসরায়েলে একটি সম্পূর্ণ নতুন ‘পরিবর্তনশীল’ সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে সাতাত্তর বছর বয়সী নেতানিয়াহুর দীর্ঘ সতেরো বছরের নিরবচ্ছিন্ন শাসনকালের অবসান ঘটানো সম্ভব হবে।
ইসরায়েলি রাজনীতিতে নেতানিয়াহু এক বিশাল ও প্রভাবশালী নাম হলেও, সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে প্রথমবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেও আইজেনকোটের নবগঠিত দল ‘ইয়াসার’ নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী লিকুদ পার্টির চেয়ে জনসমর্থনে কিছুটা হলেও এগিয়ে রয়েছে।
তবে, ইসরায়েলি রাজনীতি সব সময়ই জটিল এবং জোট-নির্ভর। জরিপগুলো একই সাথে এটিও স্পষ্ট করেছে যে ১২০ আসন বিশিষ্ট নেসেট বা ইসরায়েলি পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো নেতার জোটই এককভাবে নিশ্চিত করতে পারবে না।
ফলে নির্বাচনের ফলাফল শুধুমাত্র কোন দল কত ভোট বা আসন পেল, তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ছোট ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই মূলত নির্ধারণ করবে কে হবেন ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
মরক্কান বংশোদ্ভূত গাদি আইজেনকোটের জন্ম ১৯৬০ সালে ইসরায়েলের টাইবেরিয়াস শহরে একটি সাধারণ ইহুদি পরিবারে। তার শৈশব ও বেড়ে ওঠা মূলত দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ইলাতে। তার বাবার জন্মস্থান ছিল মরক্কোর বিখ্যাত শহর মারাকেশে এবং মায়ের জন্ম কাসাব্লাঙ্কায়।
এই পারিবারিক শেকড় তাকে ইসরায়েলের রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট অংশের মানুষের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। আইজেনকোটের সামরিক জীবনের শুরু হয় ১৯৭৮ সালে, যখন তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গোলানি ব্রিগেডের ১৩তম ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন।
এরপর নিজের যোগ্যতা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে তিনি ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে পুরো ব্রিগেডের কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ৪১ বছরের সামরিক ক্যারিয়ারে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করেছেন।
তিনি ইসরায়েলের দুজন প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ২০০০ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদার সময় অধিকৃত পশ্চিম তীরে গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি অপারেশন্স ডিরেক্টরেটের প্রধান, নর্দার্ন কমান্ডের অধিনায়ক এবং ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবেও অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৫ সালে আইজেনকোট ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ২১তম সেনাপ্রধান বা চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ২০১৯ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই শীর্ষ পদে বহাল ছিলেন। গাদি আইজেনকোটের নাম সামরিক অঙ্গনে বিশেষভাবে উচ্চারিত হয় তার প্রণীত ‘দাহিয়া ডকট্রিন’-এর কারণে।
২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের পর নর্দার্ন কমান্ড এবং অপারেশন্স ডিরেক্টরেটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এই সামরিক মতবাদটি তৈরি করেন। এই ডকট্রিনের মূল কথা হলো, লেবাননে হিজবুল্লাহর সাথে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাতে শুধুমাত্র সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত না হেনে, হিজবুল্লাহ কর্তৃক ব্যবহৃত সকল ধরনের বেসামরিক ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ মাত্রায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা।
সেনাপ্রধান হিসেবে তার অন্যতম বড় অর্জন ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘গিডিওন প্ল্যান’-এর বাস্তবায়ন, যার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর স্থল, আকাশ, নৌ, গোয়েন্দা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাইবার সক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী করা হয়।
এছাড়াও, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ধারাবাহিক ছুরি হামলার ঘটনা নিয়ন্ত্রণ এবং গাজা ও উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার ক্ষেত্রে তিনি ২০১৫ সালে বেশ কিছু অত্যন্ত কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, যা তাকে ইসরায়েলি জনগণের কাছে একজন দৃঢ়চেতা সামরিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সামরিক জীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর গাদি আইজেনকোট ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নেগেভ অঞ্চলের উন্নয়নে নিবেদিত বেন-গুরিয়ন হেরিটেজ ইনস্টিটিউটের প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বেসরকারি খাতেও বেশ কিছু পদ অলংকৃত করেছেন।
২০২২ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নেসেটের সদস্য নির্বাচিত হন এবং রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক কমিটির একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, সরকারি নীতির চরম ব্যর্থতা এবং সমাজের গভীর অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে আঞ্চলিক পর্যায়ে ইসরায়েলের সামরিক প্রতিপত্তি এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
একই বছরের অক্টোবর মাসে গাজা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় (War Cabinet) একজন মন্ত্রী হিসেবে সরাসরি যোগদান করেন এবং যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় অংশ নেন।
তবে এই যুদ্ধ তার জীবনে এক অপূরণীয় ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নিয়ে আসে। ২০২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর উত্তর গাজার জাবালিয়াতে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় তার ছেলে গাল নিহত হন এবং পরবর্তীতে গাজা উপত্যকায় চলা যুদ্ধে তার দুজন ভাইপোও প্রাণ হারান।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। গাজা উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকলেও, থেমে থেমে বোমাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণের মতো সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
গাদি আইজেনকোটের শিক্ষাগত যোগ্যতা অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। তিনি তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক, ইউনিভার্সিটি অব হাইফা থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং বিখ্যাত ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজ থেকে সামরিক বিষয়ে আরও একটি সম্মানজনক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
এছাড়া, ২০১৯ সালে রাইখম্যান বিশ্ববিদ্যালয় তাকে এক সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করে। ২০২৫ সালে তিনি মূলত প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ জানানোর লক্ষ্যেই ‘ইয়াসার’ দল গঠন করেন।
এই দলটি নিজেদের একটি যোগ্য বিকল্প সরকার হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং তাদের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো ইসরায়েলকে একটি ইহুদি, গণতান্ত্রিক, সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠিত করা।
যদিও আইজেনকোট নিজেকে পরিবর্তনের এক নতুন বার্তাবাহক হিসেবে সাধারণ ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন, তার দীর্ঘ সামরিক ইতিহাস এবং গাজা যুদ্ধের সময় যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় তার সক্রিয় ভূমিকা প্রমাণ করে যে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েলের বর্তমান সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে তার নীতিগত খুব একটা পার্থক্য নেই।
আসন্ন এই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে মূল লড়াইটা মূলত নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোটের মধ্যে, কে পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারবেন সেই প্রশ্নে। নেতানিয়াহু তার দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং কট্টর ডানপন্থী অবস্থান যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে আইজেনকোট জনমত জরিপের ইতিবাচক ফলাফলকে কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহুর শাসনের চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতে বদ্ধপরিকর।
যেহেতু কোনো জোটেরই নেসেটে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, তাই নির্বাচন শেষে ছোট দলগুলোর সমর্থন আদায় করে কে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী জোট গঠন করতে সক্ষম হবেন, সেটাই নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।