আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাও যে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান এবং জটিল একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই বিষয়টি তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
তার মতে, বৈশ্বিক এই সংকট কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত আধিপত্যবাদী কর্মকাণ্ড এবং অদূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণেই এই পরিস্থিতি আজ এতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ নিবন্ধে তিনি এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন, যা বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘ভেদোমোস্তি’-তে প্রকাশিত এক বিশদ এবং বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল চিত্র তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ২০২৫ সালের সর্বশেষ হিসাব এবং পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন যে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বছরে প্রায় ১১২ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ২০০ কোটি ঘনমিটারেরও বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস বিশ্বব্যাপী পরিচালিত মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে এবং বিশ্ব অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে এই প্রণালিটি কতটা অপরিসীম কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সময়ের বেপরোয়া সামরিক আগ্রাসন এবং তাদের অব্যাহত সামরিক হুমকির কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত এবং উসকানিমূলক পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। আরাকচি তার নিবন্ধে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত মোট গ্যাসের প্রায় নব্বই শতাংশই সরাসরি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বাজারে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
সুতরাং এই পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এশিয়ার উন্নয়নশীল এবং শিল্পোন্নত দেশগুলো বর্তমানে এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে, যা তাদের শিল্প উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপের পরিস্থিতিও যে অত্যন্ত ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক, সেটিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশ্লেষণে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে ইউরোপের বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ইতোমধ্যে কল্পনাতীতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামনেই তীব্র শীতকাল সমাগত, অথচ ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে গ্যাসের বর্তমান মজুত গত বছরের এই একই সময়ের তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে অনেক কম। গ্যাসের এই তীব্র সংকট এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে অনেক দেশের রাজপথে ইতোমধ্যে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও মূল্যস্ফীতি এক চরম আকার ধারণ করেছে। আরাকচি মনে করেন, এই সার্বিক পরিস্থিতি একটি অকাট্য সত্যকে পুনরায় প্রমাণ করেছে যে, আঞ্চলিক কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ পরিস্থিতি কখনোই শুধু সেই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা এবং উৎপাদক ও ভোক্তা উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
উদ্ভূত এই ভয়াবহ বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি ভিত্তিতে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি। তিনি তার নিবন্ধে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন।
তার মতে, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংলাপ, বোঝাপড়া এবং সহযোগিতা আরও বহুগুণে জোরদার করতে হবে। শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট পথের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প পথ তৈরি করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
পাশাপাশি, জ্বালানি উৎপাদন ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে যেকোনো ধরনের সামরিক বা সন্ত্রাসী হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সম্মিলিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর ভূ-রাজনৈতিক সংকট বা যুদ্ধাবস্থার নেতিবাচক প্রভাব কীভাবে ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে একটি কার্যকর, টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি তার সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছেন।
বৈশ্বিক এই সংকটময় পরিস্থিতিতে একটি গঠনমূলক সমাধানের পথ খুঁজতে ইরান যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় আসন্ন এক শীর্ষ সম্মেলনের খবরে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে, এই সমস্ত জটিল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করার জন্য ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চলতি সপ্তাহেই একটি উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফরে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে অবস্থান করবেন।
সেখানে তিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ১১টি গ্যাস উৎপাদনকারী দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বিশেষ শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হবেন। এই সম্মেলনে জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, ভবিষ্যৎ সরবরাহ নীতি এবং মার্কিন আধিপত্য মোকাবিলায় বিকল্প অর্থনৈতিক জোট গঠনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মস্কোর এই বৈঠক থেকে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত আসতে পারে। বিশ্ব জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামের (জিইসিএফ) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেন।
‘গ্লোবাল গ্যাস আউটলুক ২০৫৫’ শীর্ষক ওই আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, আগামী ২০৫৫ সাল নাগাদ বিশ্বে মোট যে পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদিত হবে, তার প্রায় ছিয়াশি শতাংশই আসবে এমন সব গ্যাসক্ষেত্র থেকে, যেগুলো বর্তমানে সম্পূর্ণ উৎপাদনহীন বা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
এই বিপুল সম্ভাবনাময় খাতের কথা উল্লেখ করে আরাকচি জানান যে, প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুতের দিক থেকে রাশিয়ার ঠিক পরেই বিশ্বে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।
ফলে আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে ইরান এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকা পালন করার সম্পূর্ণ সক্ষমতা রাখে। তার মতে, বিশ্বব্যাপী একটি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন গ্যাস উত্তোলনের প্রকল্পের উন্নয়ন এবং ভূগর্ভে সঞ্চিত বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদকে কার্যকরভাবে উত্তোলন ও বিশ্ববাজারে সরবরাহে রূপান্তর করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
পরিশেষে, আন্তর্জাতিক গ্যাস বাজারে জিইসিএফ-এর সদস্য দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের কথা উল্লেখ করে আরাকচি কিছু পরিসংখ্যানগত উপাত্ত উপস্থাপন করেন। তিনি জানান যে, গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর এই শক্তিশালী জোটটি ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় আটত্রিশ শতাংশ এককভাবে সরবরাহ করেছে।
শুধু তাই নয়, দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২০৫৫ সাল নাগাদ বিশ্ববাজারে তাদের এই সরবরাহের অংশীদারিত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়ে চুয়াল্লিশ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, আগামী দশকগুলোতে বৈশ্বিক প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের যে নিট প্রবৃদ্ধি ঘটবে, তার প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশই কেবল এই জোটভুক্ত দেশগুলোর অবদান থেকে আসবে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন।
এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা দেশগুলোর নানামুখী নিষেধাজ্ঞা এবং চাপ সত্ত্বেও বৈশ্বিক জ্বালানি কূটনীতিতে ইরান এবং রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন এই দেশগুলো আগামী দিনগুলোতে মূল নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে।
বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থেই এই দেশগুলোর ওপর সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করে তাদের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের প্রতি প্রচ্ছন্ন এক বার্তাই যেন ফুটে উঠেছে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সুদীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে।