অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মাপকাঠিতে এই নির্বাচনকে ইসরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়ে গেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সংঘটিত অভাবনীয় হামলার পর ইসরায়েলে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনটি কার্যত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে একটি অঘোষিত গণভোটে পরিণত হয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষ ও সাধারণ ভোটারদের মনে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায়ভার কার ওপর বর্তাবে, আল্ট্রা-অর্থোডক্স বা কট্টরপন্থী ইহুদিদের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করা হবে কি না, দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল কী হবে-এই বিষয়গুলো এবারের নির্বাচনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুটি বৈশ্বিক পরিসরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও, সাধারণ ইসরায়েলিদের কাছে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি এই নির্বাচনে খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি থেকে শুরু করে তার প্রধান বিরোধী দলগুলোসহ প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় ইহুদি রাজনৈতিক দল এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।
কেবল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংখ্যালঘু আরব দলগুলোই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি নিজেদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনী লড়াই হতে যাচ্ছে অত্যন্ত তীব্র ও হাড্ডাহাড্ডি।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এবং বিরোধী শিবিরের জনসমর্থন প্রায় সমান্তরাল। ইসরায়েলে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে হলে ১২০ আসনবিশিষ্ট নেসেটে অন্তত ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে হয়। কোন জোট শেষ পর্যন্ত এই ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারবে, তা মূলত ছোট ছোট দলগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচন-পরবর্তী জটিল হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করছে।
ইসরায়েলের সংসদীয় নির্বাচন মূলত আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হয়। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ইসরায়েলি নাগরিকরা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে নয়, বরং সরাসরি রাজনৈতিক দলকে ভোট প্রদান করেন।
দেশব্যাপী একটি দল মোট প্রাপ্ত ভোটের যে শতাংশ লাভ করে, সেই অনুপাতেই নেসেটে তাদের আসনসংখ্যা নির্ধারিত হয়। নির্বাচনের পূর্বেই প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের সম্ভাব্য সংসদ সদস্যদের একটি তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়।
নেসেটে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হলে একটি দলকে দেশব্যাপী কাস্ট হওয়া মোট ভোটের অন্তত ৩.২৫ শতাংশ পেতে হয়, যা পার করলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যূনতম চারটি আসন লাভ করে। ইসরায়েলি নির্বাচন আইনে ১৯৭৩ সালের বাদর-ওফার পদ্ধতি অনুসরণ করে আসনগুলো চূড়ান্তভাবে বণ্টন করা হয়।
কোনো দল যদি ৩.২৫ শতাংশের ন্যূনতম সীমা বা ‘ইলেক্টোরাল থ্রেশহোল্ড’ পার হতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের প্রাপ্ত ভোটগুলো একটি জটিল গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে উত্তীর্ণ দলগুলোর মধ্যে আনুপাতিক হারে ভাগ করে দেওয়া হয়।
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর, ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট নেসেটে নির্বাচিত সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনায় বসেন। আলোচনার ভিত্তিতে যাকে সরকার গঠনের জন্য সবচেয়ে যোগ্য মনে হয়, প্রেসিডেন্ট তাকেই আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট প্রদান করেন।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো একক দল কখনোই ৬১টি আসন পায়নি, তাই সরকার গঠন সবসময়ই একটি বহুদলীয় জোট বা কোয়ালিশনের ওপর নির্ভরশীল। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা যদি ২৮ দিনের মধ্যে একটি কার্যকর জোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হন, তবে প্রেসিডেন্ট অন্য কোনো নেতাকে সুযোগ দিতে পারেন অথবা বিষয়টি সমাধানের জন্য পার্লামেন্টের ওপর ছেড়ে দিতে পারেন। আর যদি কোনোভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করা সম্ভব না হয়, তবে ইসরায়েলকে বাধ্য হয়ে আরেকটি নতুন নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হতে হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিচালনা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের পরও বর্তমান নেসেট ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো তাদের চার বছরের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে যাচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক দৃশ্যপট অত্যন্ত মসৃণ হবে।
নতুন জোট গঠন করার ক্ষেত্রে অমীমাংসিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো-আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, আল্ট্রা-অর্থোডক্স যুবকদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহত ছাড় দেওয়া হবে কি না এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কোনো সম্ভাব্য জাতীয় ঐক্যের সরকারে বিরোধী দলের নেতারা যোগদান করবেন কি না।
এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক মেরুকরণ আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। প্রার্থীরা মূলত দুটি বড় শিবিরে বিভক্ত হয়ে লড়ছেন: নেতানিয়াহু-পন্থী জোট এবং নেতানিয়াহু-বিরোধী শিবির। নেতানিয়াহু শিবিরের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ওৎজমা ইয়েহুদিত দলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতমার বেন-গভির, শাস দলের নেতা আরিয়েহ ডেরি এবং রিলিজিয়াস জায়োনিজম দলের নেতা ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ।
তবে এই ডানপন্থী জোটেও ফাটল ধরেছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির মতো নীতিগত ইস্যুতে বেন-গভিরের দল সাময়িকভাবে জোট ত্যাগ করেছিল। অন্যদিকে, আল্ট্রা-অর্থোডক্স তরুণদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের আইন নিয়ে তীব্র মতবিরোধের জেরে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু-বিরোধী শিবিরে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ‘ইয়াসার’ দলের নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও রাজনীতিতে নতুন করে ফিরে এসেছেন এবং ইয়াইর লাপিদের ‘ইয়েশ আতিদ’ দলের সঙ্গে মিলে ‘বিইচাদ’ নামের একটি নতুন জোট গঠন করেছেন। এছাড়া ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’ দলের ইয়াইর গোলান এবং ‘ইসরাইল বেইতেনু’ দলের নেতা অ্যাভিগডোর লিবারম্যানও বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ।
নেতানিয়াহুর নিজ জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের কারণে নির্বাচনের সুস্পষ্ট ফলাফল আগে থেকে পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, সামরিক নিয়োগ ইস্যুতে তীব্র মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ইঙ্গিত দিয়েছে যে আইজেনকোটের নেতৃত্বে কোনো সরকার গঠিত হলে তারা তাতে বাধা প্রদান করবে না।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বেন-গভিরের মতো কট্টরপন্থী শরিকদের রাজনৈতিক এজেন্ডা নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক হতে পারে। নেতানিয়াহু-বিরোধী জোট নিজেদের পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে তুলে ধরছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এই শিবিরের শীর্ষ নেতারা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে তাদের ভবিষ্যৎ রূপরেখা বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ অক্টোবরের ঘটনার তদন্তে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠন, আল্ট্রা-অর্থোডক্সদের সামরিক নিয়োগের বিষয়ে একটি স্থায়ী সমাধান, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা নির্দিষ্টকরণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
তবে এই ‘পরিবর্তনের জোট’ নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে কাকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসাবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। তাছাড়া, আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেয়নি। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে, আল্ট্রা-অর্থোডক্স বা আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া বিরোধী শিবিরের পক্ষে ৬১টি আসন অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক যথেষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ। তবে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ইসরায়েলের কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো আকস্মিক ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ইরান, লেবানন ও সিরিয়ার প্রতি কট্টর নিরাপত্তা নীতি বজায় রাখা এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতার প্রশ্নে ইসরায়েলের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক ঐক্য বিদ্যমান।
তবে নতুন কোনো মধ্যপন্থী জোট ক্ষমতায় এলে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের চরমপন্থী আচরণের বিরুদ্ধে তারা হয়তো কিছুটা কঠোর অবস্থান নিতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এবং জর্ডানের মতো মিত্রদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের কিছুটা উন্নয়ন ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
পরিশেষে, এটি স্পষ্ট যে ২৭ অক্টোবরের ভোট গ্রহণের পরই ইসরায়েলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো স্থায়ী সরকার গঠিত হচ্ছে না। বরং শুরু হবে দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল রাজনৈতিক দরকষাকষি। তাই একটি নতুন ও স্থিতিশীল সরকার না আসা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সতর্ক দৃষ্টি থাকবে ইসরায়েলের এই নির্বাচনের ওপর।