ভোট প্রদান পর্ব শেষ করে তিনি গণমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান ডানপন্থী জোটই এবারের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে চলেছে।
তার এই বক্তব্য মূলত ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ডানপন্থী শিবিরের দৃঢ় অবস্থানেরই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। ভোটকেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি নিজের জোটের বিজয়ের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে সংক্ষেপে বলেন, "আমরাই জয়লাভ করব।"
এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী বাক্যের মাধ্যমে তিনি মূলত তার উগ্র জাতীয়তাবাদী সমর্থকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও জয়ের ব্যাপারে এক অটুট বিশ্বাস সঞ্চার করার চেষ্টা করেছেন। বেন-গভিরের এই মন্তব্য ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক অস্থির সময়ের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে ডানপন্থী শক্তিগুলো নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বেন-গভির একটি অতি পরিচিত এবং একই সাথে চরম বিতর্কিত নাম। তিনি দীর্ঘকাল ধরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং উগ্র ইহুদি আধিপত্যবাদের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখে আসছেন।
তাই তার ভোট প্রদানের স্থান হিসেবে কিরিয়াত আরবা বসতিকে বেছে নেওয়াটাও কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘ এই ধরনের বসতিগুলোকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ দখলদারিত্বের প্রতীক হিসেবে দেখে থাকে।
কিন্তু বেন-গভিরের মতো কট্টরপন্থীরা এই ভূখণ্ডগুলোকে নিজেদের ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় অধিকার বলে দাবি করেন। সেই বিতর্কিত স্থান থেকেই তিনি নেতানিয়াহুর জোটের পক্ষে প্রচারণার শেষ মুহূর্তের সুর বেঁধে দিয়েছেন, যা তার আদর্শিক অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।
কিরিয়াত আরবা বসতিটির ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক গুরুত্বও এক্ষেত্রে গভীর আলোচনার দাবি রাখে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই ইহুদি বসতিটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখে সম্পূর্ণ অবৈধ।
চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দখলকারী শক্তি তার নিজস্ব বেসামরিক জনসংখ্যাকে জোরপূর্বক বা স্বেচ্ছায় অধিকৃত ভূখণ্ডে স্থানান্তর করতে পারে না। কিন্তু ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে এই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আসছে এবং কিরিয়াত আরবার মতো বসতিগুলো সেই নীতি লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় ও জ্বলন্ত প্রমাণ।
বেন-গভিরের মতো নেতারা এই বসতিগুলোকেই নিজেদের মূল রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেন। এখানকার বাসিন্দারা মূলত চরম উগ্রপন্থী ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী। এমন একটি জায়গা থেকে ভোট দিয়ে যখন বেন-গভির বিজয়ের হুংকার দেন, তখন সেটি ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্যও একটি গভীর উদ্বেগ ও হতাশার বার্তা বহন করে।
নিজের বক্তব্যের এক পর্যায়ে বিরোধী শিবিরের বিজয়ের সম্ভাব্য পরিণতির কথা তুলে ধরে বেন-গভির ইসরায়েলি ভোটারদের কড়া ভাষায় সতর্ক করে দেন। তিনি দাবি করেন যে, যদি কোনোভাবে বিরোধী দল এই নির্বাচনে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়, তবে দেশের শাসনভার এমন একটি দুর্বল ও আপসকারী সরকারের হাতে চলে যাবে, যার নেতৃত্বে বা নেপথ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে থাকবেন ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দল ‘রা’আম’-এর চেয়ারম্যান মনসুর আব্বাস।
মনসুর আব্বাস এবং তার দল ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের নাগরিক অধিকার আদায়ে সোচ্চার এবং অতীতে তারা সরকার গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বেন-গভির মূলত তার কট্টর ডানপন্থী ইহুদি সমর্থকদের মধ্যে অত্যন্ত সুকৌশলে এই ভীতি জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন যে, আরবদের প্রভাবাধীন বা আরব দলগুলোর সমর্থনে গঠিত কোনো সরকার ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
মনসুর আব্বাস এবং তার দল রা'আম-এর ব্যাপারে বেন-গভিরের যে প্রকাশ্য ভীতির কথা উচ্চারিত হয়েছে, তার পেছনেও রয়েছে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ ডেমোগ্রাফিক বা জনসংখ্যার কাঠামোগত জটিল সমীকরণ। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই হলো আরব নাগরিক।
যদি এই বিশাল জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে তারা যেকোনো নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পুরোপুরি সক্ষম। অতীতে মনসুর আব্বাস প্রমাণ করেছেন যে, আরব দলগুলো আর কেবল বিরোধী বেঞ্চে বসে থাকার জন্য নয়, বরং তারা সরকারে সরাসরি অংশ নিয়ে নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ এবং নীতিগত পরিবর্তন আনতে সমানভাবে আগ্রহী।
বেন-গভির আরবদের এই রাজনৈতিক উত্থান ও পরিবর্তনকে ইহুদি রাষ্ট্রের মূল চরিত্রের জন্য একটি অস্তিত্বমূলক সংকট হিসেবে দেখেন। তাই তিনি তার প্রচারণায় মনসুর আব্বাসের নাম ব্যবহার করে সাধারণ ইহুদি ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের 'আরব-ভীতি' বা প্যানিক তৈরি করার চিরাচরিত কৌশল অবলম্বন করেছেন।
তার এই বিভাজনের কৌশল অতীতেও অনেক কট্টর ডানপন্থী নেতার জন্য জাদুকরী কাজ করেছে এবং এবারের নির্বাচনেও এটি তার একটি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার। এই জটিল ও মেরুকৃত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই তিনি প্রতিটি নাগরিককে তাদের নিজ নিজ ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, "এ কারণেই আজ প্রত্যেককে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোট দিতে হবে।" তার এই আহ্বানের মূল উদ্দেশ্য হলো ডানপন্থী এবং দোদুল্যমান ভোটারদের ভোটদানে সর্বোচ্চ মাত্রায় উৎসাহিত করে বিরোধী শিবিরের যেকোনো আকস্মিক উত্থানকে রুখে দেওয়া।
তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, কেবল বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো একজন অভিজ্ঞ ও ডানপন্থী নেতার নেতৃত্বাধীন জোটই ইসরায়েলের সার্বিক নিরাপত্তা এবং কট্টর রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হবে।
নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা বিতর্কে জর্জরিত হলেও, কট্টর ডানপন্থীদের কাছে তিনি এখনও রক্ষাকবচ এবং অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রতীক।
বেন-গভির তার বক্তব্যের একেবারে উপসংহারে এই ডানপন্থী জোটের অপরিহার্যতা তুলে ধরে বলেন, "একটি শক্তিশালী, ডানপন্থী সরকার মানেই হলো একটি শক্তিশালী ইসরায়েল রাষ্ট্র।" এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে দেশবাসীকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মধ্যপন্থী, বামপন্থী বা আরবদের সমর্থনপুষ্ট কোনো জোট সরকার ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে চরম দুর্বলতা প্রদর্শন করতে পারে, যা বর্তমান অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আত্মঘাতী হতে পারে।
সবকিছুর শেষে বলা যায়, ইসরায়েলের এবারের এই নির্বাচন শুধুমাত্র একটি নতুন সরকার গঠন বা ক্ষমতার হাতবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি দেশটিতে আইনের শাসন, মানবাধিকার, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে।
ইতামার বেন-গভিরের মতো চরমপন্থী নেতারা যদি এই নির্বাচনে পুনরায় বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন এবং নেতানিয়াহুকে একটি শক্তিশালী ডানপন্থী জোট গঠনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন, তবে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া যে আরও কয়েক দশক পিছিয়ে যাবে, তা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারেন।
এর ফলে ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন আরও ধূসর হয়ে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল হয়তো আরও বেশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হতে পারে।
তবুও, বেন-গভির এবং তার সমর্থকদের কাছে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বা মানবাধিকারের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি "শক্তিশালী ইসরায়েল" গড়ে তোলা, যার সংজ্ঞা ও সীমারেখা তিনি এবং তার কট্টর ডানপন্থী মিত্ররাই একচেটিয়াভাবে নির্ধারণ করবেন।
তাদের প্রণীত এই সংজ্ঞায় অন্য কোনো জাতি, ধর্ম বা ভিন্নমতের মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার কোনো সমতাভিত্তিক স্থান নেই। এখন পুরো বিশ্বের তীক্ষ্ণ নজর থাকবে ইসরায়েলের ব্যালট বাক্সের ফলাফলের ওপর, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করবে যে বেন-গভিরের এই দম্ভোক্তি সত্যিই বাস্তবায়িত হলো কি না, নাকি ইসরায়েলের সাধারণ জনগণ চরমপন্থার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ব্যালটের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো শান্তির বার্তা দিল।