আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সামরিক আগ্রাসনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব মোকাবিলা এবং ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করার লক্ষ্যে একমঞ্চে সমবেত হয়েছেন ইসলামি বিশ্বের চার প্রভাবশালী রাষ্ট্র-ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক, গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত একটি নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় বা নিজস্ব স্বকীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই বৈঠক একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও এর আশপাশের অঞ্চলে যে বিদেশি পরাশক্তির প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি চলে আসছে, এই চতুর্মুখী ঐক্যের মাধ্যমে মূলত তার বিপরীতে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরোধ গড়ার সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বৈঠকে নিজ নিজ দেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান আল সৌদ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিন।
তাদের সঙ্গে এই গভীর কৌশলগত আলোচনায় স্বাগতিক দেশ ইরানের পক্ষে অংশ নেন দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মেজর জেনারেল মহসেন রেজাই, ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
শীর্ষ এই সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এই বৈঠকটিকে কতটা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। কেবল সাধারণ কূটনৈতিক আলোচনা নয়, বরং প্রতিরক্ষা, সামরিক কৌশল এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো গভীর জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো যে এই বৈঠকের কেন্দ্রে ছিল, তা অংশগ্রহণকারী নেতাদের পদমর্যাদা থেকেই স্পষ্টভাবে অনুমেয়।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বিশেষ করে গাজা ও লেবাননে চলমান সামরিক আগ্রাসনের ফলে পুরো অঞ্চলে যে অস্থিতিশীলতা, প্রাণহানি ও চরম মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের কার্যকর উপায় খোঁজা হয়েছে এই চতুর্মুখী আলোচনায়।
ফিলিস্তিন ও লেবাননের মজলুম মানুষের প্রতি এই চার দেশ তাদের সম্মিলিত সমর্থন ও গভীর সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি, কীভাবে একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামোর মাধ্যমে এই লাগামহীন আগ্রাসন প্রতিহত করা যায়, তা নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা করেছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলগুলোতে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং সংঘাত যাতে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। সোমবার এই ঐতিহাসিক বৈঠকের আগে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপ-সচিব আলী বাঘেরি গণমাধ্যমের কাছে এই আয়োজনের প্রেক্ষাপট ও মূল লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে, পশ্চিম এশিয়ায় বা মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘অভ্যন্তরীণ ও নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ বা বহিরাগত হস্তক্ষেপমুক্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় বাস্তবায়নের ধারণাকে এগিয়ে নিতেই সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ কর্মকর্তারা তেহরান সফর করছেন।
বহিরাগত বা পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর সামরিক উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপ ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের সামর্থ্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই নিশ্চিত করবে-এটিই মূলত এই যুগান্তকারী ধারণার মূলভিত্তি।
আলী বাঘেরি তার বক্তব্যে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের তেহরান সফরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সেই সফরে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মেজর জেনারেল মহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে আসিম মুনির প্রথম এই চতুর্মুখী আলোচনার সুনির্দিষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন।
তিনি জানিয়েছিলেন যে, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা একটি যৌথ ও সমন্বিত বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য তেহরান সফরে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এই বহুল প্রতীক্ষিত সফরের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে মেজর জেনারেল মহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে গভীর, নিবিড় ও কার্যকর পরামর্শ করা, যাতে করে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা রূপরেখা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়।
বাঘেরির মতে, এই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী তিনটি দেশ এবং ইরান যদি যৌথভাবে কাজ করে, তবে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের যে কার্যকর ধারণা ইরান পোষণ করে, তা বাস্তবায়নের পথে এটি একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তা গঠনের ক্ষেত্রে ইরানের যে দীর্ঘ, পরীক্ষিত ও সফল অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে এই চার দেশ সমগ্র অঞ্চলের জন্য একটি টেকসই ও শক্তিশালী নিরাপত্তা মডেল তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এই ধরনের একটি মডেল প্রতিষ্ঠিত হলে তা আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস দূর করে পারস্পরিক আস্থার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এদিকে, এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অত্যন্ত জোরালো ও সুস্পষ্ট ভাষায় আঞ্চলিক ঐক্য এবং সংহতির ডাক দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ঘটা বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলটি লাগামহীন অপরাধযজ্ঞ ও আগ্রাসনের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি সুদৃঢ়, অটুট ও ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠন করা।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের মতে, যদি ইসলামি বিশ্ব নিজেদের মধ্যকার সকল বিভেদ ভুলে একতাবদ্ধ হতে পারে, তবে তা যেকোনো আগ্রাসী শক্তিকে তার চলমান ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়া থেকে চূড়ান্তভাবে বিরত রাখতে সক্ষম হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সাম্প্রতিক আগ্রাসী নীতির কড়া সমালোচনা করে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, বিরুদ্ধ শক্তিগুলো ভেবেছিল যে, অব্যাহত অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে ইরানকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলা বা এর পতন ঘটানো সম্ভব হবে।
কিন্তু তাদের সেই ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং এই বহুমুখী চাপ ও আগ্রাসন ইরানের জাতীয় ঐক্য, সংহতি এবং দেশপ্রেমকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী, ইস্পাতকঠিন ও সুদৃঢ় করেছে। বাইরের শত্রুর হুমকি মূলত দেশের জনগণকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বলেন, বহুমুখী বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবরোধ এবং চরম প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইরানের সাহসী জনগণ নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষায় পাহাড়ের মতো অবিচল ও অনড় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
যারা মনে করে যে, সামরিক বা অর্থনৈতিক ভয় দেখিয়ে ইরানকে মাথা নত করতে বা আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে, তারা এক চরম ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে বসবাস করছে। মাতৃভূমির অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানের জনগণ কখনোই বিন্দু পরিমাণ আপস করবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন।
বৈঠকের শেষাংশে ইসলামি দেশগুলোর বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, যেকোনো ধরনের গঠনমূলক সমঝোতা বা পদক্ষেপ যা ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে প্রকৃত ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় সরাসরি সহায়তা করে, ইরান সর্বদা তাকে নিঃশর্ত ও সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়ে যাবে।
তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যদি তাদের নিজেদের মধ্যে থাকা রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে পারস্পরিক বিপুল সম্ভাবনা ও প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর ওপর নির্ভর করে একজোট হয়, তবে তারা সমগ্র বিশ্বের সামনে ন্যায়বিচার, শান্তি, প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের এক অনন্য ও অনুকরণীয় মডেল উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বিশ্ব নিশ্চিত করবে।