মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আরব ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে উৎকণ্ঠিত নেতানিয়াহু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম

আরব ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে উৎকণ্ঠিত নেতানিয়াহু
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইসরায়েলের পার্লামেন্ট বা নেসেটের সাধারণ নির্বাচনে আজ এক অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। দেশটিতে অনুষ্ঠিত এই জাতীয় নির্বাচনে গত পঁয়তাল্লিশ বছরের নির্বাচনী ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতির রেকর্ড সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

 

সকাল থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিকরা নিজেদের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগের লক্ষ্যে দলে দলে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমাতে শুরু করেন। তবে এবারের এই অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও নির্ণায়ক দিকটি হলো আরব ভোটারদের ব্যাপক, অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

 

ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক বঞ্চনা, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও তীব্র ক্ষোভ থেকে জাতীয় নির্বাচনে ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের প্রায়শই বিরত রাখতেন।

 

কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে; তারা আগের সব রেকর্ড ও নীরবতা ভেঙে দলে দলে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মতামতের জোরালো প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন, যা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।

 

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থা মূলত সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিচালিত হয়। এই বিশেষ ও জটিল নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে নির্বাচনে প্রদত্ত সাধারণ মানুষের প্রতিটি ভোটের গুরুত্ব অপরিসীম।

 

পিআর পদ্ধতিতে কোনো রাজনৈতিক দল দেশব্যাপী যে নির্দিষ্ট অনুপাতে সাধারণ মানুষের বৈধ ভোট লাভ করে, পার্লামেন্ট বা ১২০ আসনবিশিষ্ট নেসেটের মোট আসনের মধ্যে ঠিক সেই অনুপাতেই তাদের সংসদীয় আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়।

 

অর্থাৎ, একটি রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার সরাসরি তাদের আইনসভার আসনের সংখ্যা ও রাজনৈতিক শক্তি নির্ধারণ করে দেয়। এমন একটি চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটারদের উপস্থিতির হার, বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর আকস্মিক ও ব্যাপক ভোটদান, নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফলের ওপর অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

 

আরব ভোটারদের এই আকস্মিক ও বিপুল উপস্থিতি তাই স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনী হিসাব-নিকাশকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। জনমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা বিশ শতাংশই হলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক।

 

বছরের পর বছর ধরে এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা, দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক এবং মৌলিক অধিকারবঞ্চিত বলে মনে করে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের কণ্ঠস্বর চরমভাবে অবহেলিত থেকেছে, যার ফলে জাতীয় নির্বাচনগুলোতে তাদের অংশগ্রহণের হার বরাবরই হতাশাজনক ও নিম্নমুখী ছিল।

 

অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি চরম অনাস্থা থেকে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট বর্জন করার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের এই দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙার বিষয়টি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন গণতান্ত্রিক মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

তারা অত্যন্ত গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, ইসরায়েলি পার্লামেন্টে নিজেদের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের দীর্ঘদিনের আর্থসামাজিক বঞ্চনার কোনো স্থায়ী ও নিয়মতান্ত্রিক সমাধান সম্ভব নয়। মূলত এই রাজনৈতিক উপলব্ধির কারণেই তারা আজ নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগে এতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন।

 

ভোটকেন্দ্রগুলোতে আরব ভোটারদের এই বিপুল ও অভূতপূর্ব উপস্থিতি দেখে ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তার নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি জোটের মিত্ররা দৃশ্যতই চরম উৎকণ্ঠা, হতাশা ও ভীতির মধ্যে পড়েছেন।

 

আরব ভোটারদের এই নীরব ব্যালট-বিপ্লব ডানপন্থি জোটের পুনরায় সরকার গঠনের পথে সবচেয়ে বড় ও দুর্লঙ্ঘ্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে তারা গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন। নিজেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার এই প্রবল ভীতি থেকে তারা এখন নির্বাচনী মাঠে এক নতুন কৌশল অবলম্বন করেছেন।

 

তারা অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও শঙ্কা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যাতে ডানপন্থি এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী ইহুদি ভোটাররা আরবদের উপস্থিতি দেখে আরও বেশি সংখ্যায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন।

 

নেতানিয়াহু এবং তার রাজনৈতিক মিত্ররা প্রকাশ্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে বলছেন যে, আরব নাগরিকরা যদি এভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে বিপুল পরিমাণে ভোট দিতে থাকে, তবে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ডানপন্থি ও কট্টর ইসরায়েলপন্থিদের নিশ্চিত পতন ঘটবে।

 

সাধারণ ভোটারদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্ম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও উসকানিমূলক পোস্টে তিনি তার কট্টর সমর্থকদের সতর্ক করে একটি জরুরি বার্তা প্রদান করেছেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওই পোস্টে তিনি সরাসরি উল্লেখ করেছেন যে, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের বহনকারী শত শত বাস অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ভোটকেন্দ্রগুলোতে আরব ভোটারদের দীর্ঘ লাইনের উদ্বেগজনক তথ্যও প্রতিনিয়ত তার কাছে এসে পৌঁছাচ্ছে বলে তিনি ওই পোস্টে দাবি করেন।

 

নেতানিয়াহুর এই স্পর্শকাতর বার্তার মূল উদ্দেশ্যই হলো তার ডানপন্থি ও রক্ষণশীল ইহুদি ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটের আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যাতে তারা আরবদের এই রাজনৈতিক উত্থান ঠেকাতে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে মূলত তার ভোট বাড়ানোর একটি মরিয়া ও চিরাচরিত রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। নেতানিয়াহুর এই জাতিগত ভীতি প্রদর্শনের কৌশলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে সুর মিলিয়েছেন তার জোটের অন্যতম চরমপন্থি নেতা এবং বর্তমান সরকারের উগ্র জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভির।

 

তিনি সরাসরি ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত আরব অধ্যুষিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর কাফর কাশেমে সশরীরে উপস্থিত হয়ে সেখান থেকে একটি উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। কাফর কাশেমে গিয়ে এমন একটি কট্টর বার্তা দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়, কারণ এই শহরটির সঙ্গে আরব ইসরায়েলিদের অনেক ঐতিহাসিক স্মৃতি ও ট্র্যাজেডি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

 

নিজের প্রকাশিত ওই ভিডিও বার্তায় ইতামার বেন গিভির অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তার ডানপন্থি ও কট্টর ইহুদি সমর্থক ভোটারদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা ভোটদানের হারে কোনোভাবেই আরবদের চেয়ে সংখ্যায় পিছিয়ে না থাকেন। তিনি তাদের ব্যাপকভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেন।

 

ইতামার বেন গিভির তার প্রকাশিত ওই ভিডিও বার্তায় অত্যন্ত কট্টর ও উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থান থেকে সুস্পষ্ট হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, "যদি আপনারা সত্যি সত্যিই চান যে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি তার নিজস্ব ঐতিহাসিক চরিত্র বজায় রেখে একটি সম্পূর্ণ ইহুদি এবং কট্টর ইহুদিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকুক, তবে আজই আপনাদের ভোট দিতে যেতে হবে।"

 

তার এই বক্তব্য স্পষ্টতই ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে জাতিগত বিভাজনকে আরও বেশি উসকে দেওয়ার এবং রাজনৈতিক ফায়দা লোটার একটি অপপ্রয়াস বলে মনে করছেন সমালোচকরা।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডানপন্থি নেতাদের এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য ও ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে এবারের নির্বাচনে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধরে রাখা নিয়ে কতটা গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছেন।

 

আরব ভোটারদের এই অভাবনীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত গণতান্ত্রিক জাগরণ ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিতে পারে এবং সেই সম্ভাব্য পরিবর্তনের ভয়েই আজ ইসরায়েলের কট্টরপন্থি রাজনৈতিক শিবির এতটা বিচলিত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল কেবল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেই নয়, বরং ফিলিস্তিন ইস্যুসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকেও সম্পূর্ণ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে।

 

- আল জাজিরা