জেরুজালেমে নিজ রাজনৈতিক দল লিকুদ পার্টির সদর দপ্তরে সমবেত হাজারো উল্লসিত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক আবেগঘন ও উদ্দীপনামূলক ভাষণে তিনি দেশে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, ডানপন্থী এবং জাতীয় সরকার গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে এই ঘোষণাকে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেতানিয়াহু অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, ইহুদি জনগণ এবং যারা ইহুদি রাষ্ট্রকে সমর্থন করে, তাদের মধ্যে ডানপন্থী জোট এবার এক ‘নির্ধারক সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ লাভ করতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি প্রণয়নে তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করবে।
লিকুদ পার্টির সদর দপ্তরে আয়োজিত এই বিজয় সমাবেশে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। সমর্থকদের মুহুর্মুহু করতালি ও স্লোগানের মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু তার বক্তব্য শুরু করেন। ভাষণের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা ও বিনয়ের সঙ্গে দলের প্রতিটি মানুষের অবদানের কথা স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, “আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। লিকুদ দলের প্রতিটি সদস্য, কর্মী এবং আমাদের অসামান্য লিকুদ তালিকার সকল সদস্যদের প্রতি আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। একইসঙ্গে আমাদের সরকারের সদস্যদের প্রতিও আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”
এই বিজয়ের পেছনে দলের প্রতিটি স্তরের মানুষের যে ত্যাগ ও শ্রম রয়েছে, তা তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন, যা মূলত দলের মধ্যকার ঐক্য আরও সুদৃঢ় করার এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশল।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি নেতানিয়াহুর এই ভাষণের একটি বিশাল অংশ জুড়ে ছিল ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্য ও প্রতিরক্ষা কৌশল। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, তা তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
সামরিক বাহিনীর বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের নেওয়া অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত, ইসরায়েলি জনগণের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এবং সর্বোপরি আমাদের বীর সৈন্যদের অসীম সাহসিকতার বদৌলতে আমরা এমন কিছু অলৌকিক কাজ সম্পন্ন করেছি, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছে।”
তার এই কথার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সামরিক অভিযানের সুনির্দিষ্ট সাফল্যগুলোর কথা উল্লেখ করতে গিয়ে নেতানিয়াহু বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার নাম উল্লেখ করেন, যাদের ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করত।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, “আমরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দেইফ, হানিয়াহ, সিনওয়ার, নাসরুল্লাহ এবং খামেনিকে চিরতরে নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছি।” এই নামগুলোর উল্লেখ করে তিনি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর নিখুঁত অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার কথাই মূলত বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
সীমান্ত সুরক্ষার বিষয়েও তিনি তার সরকারের সাফল্যের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান যে, গাজা উপত্যকার একেবারে গভীর অভ্যন্তরে, লেবাননের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং এমনকি সিরিয়ার ভেতরেও ইসরায়েল নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা অঞ্চল স্থাপন করেছে।
এর মাধ্যমে ইসরায়েল মূলত শত্রুদের যেকোনো সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশের অস্তিত্বের ওপর যে চরম হুমকি ঝুলছিল, তা কীভাবে প্রতিহত করা হয়েছে, সে বিষয়েও নেতানিয়াহু বিস্তারিত আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, “আমরা আমাদের ওপর ঝুলন্ত এক অবধারিত অস্তিত্বের হুমকি, যা আমাদের তাৎক্ষণিক ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারত, তা সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছি। আমরা ইরানি সরকারের ওপর আঘাত হেনেছি এবং একে একেবারে অতল গহ্বরের প্রান্তে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল, আর অন্যদিকে ইসরায়েল অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নাগরিকদের মনে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান শক্তির বিষয়ে একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়েছেন।
ভাষণের এই পর্যায়ে তিনি পুনরায় তার দেশের জনগণ ও সামরিক বাহিনীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি আবেগপূর্ণ কণ্ঠে বলেন, “আমি আপনাদের সবাইকে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের বীর সৈন্যদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন ও অসংখ্য ধন্যবাদ।
আমাদের অটল ও দৃঢ়চেতা জনগণকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা যেসব কঠিন ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেগুলোকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করার জন্য আপনাদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।” এই কথাগুলোর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, ইসরায়েলের বর্তমান সাফল্য কোনো একক ব্যক্তির নয়, বরং এটি সমগ্র দেশবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার এক অনন্য ফসল।
এতসব সাফল্যের কথা বললেও, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অত্যন্ত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তার সমর্থকদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এখনই আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার এই যুদ্ধ এখনও সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত হয়নি।
গভীর উদ্বেগ ও সতর্কতার সঙ্গে তিনি বলেন, “এবং তবুও, আমার প্রিয় বন্ধুরা, এত বড় বড় সাফল্যের পরও আমি আপনাদের অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চাই- এই লড়াই এখনও শেষ হয়নি। কারণ যতদিন পর্যন্ত বিশ্বে সেই ধর্মান্ধ সরকারগুলোর অস্তিত্ব টিকে থাকবে, এমন সরকার যারা তাদের ব্যানারে আমাদের ধ্বংসের কথা খোদাই করে রেখেছে, যারা তাদের অস্তিত্বের একেবারে মূল উদ্দেশ্য হিসেবেই আমাদের বিনাশকে সংজ্ঞায়িত করেছে, ততদিন পর্যন্ত তারা আমাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার জন্য বারবার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।”
এই সতর্কতা প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যৎ যেকোনো হুমকির বিষয়ে ইসরায়েল অত্যন্ত সচেতন রয়েছে। এই চিরস্থায়ী হুমকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক মিত্রদের ভূমিকার কথাও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি তিনি তার ভাষণে অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরেন।
নেতানিয়াহু বলেন, “আমাদের চমৎকার ও বিশ্বস্ত বন্ধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার মাধ্যমে এই অস্তিত্বের হুমকি চিরতরে দূর করা এখন সম্পূর্ণভাবে আমাদের ক্ষমতার আওতার মধ্যেই রয়েছে।” এই কথার মাধ্যমে তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার ঐতিহাসিক মিত্রতা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিষয়টি আরও একবার বিশ্ববাসীর সামনে নিশ্চিত করেছেন।
রাজনৈতিক ফ্রন্ট এবং দেশের ভবিষ্যৎ সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে নেতানিয়াহু তার পূর্ববর্তী অবস্থানেই অনড় থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “এবং ঠিক সেই কারণেই আমি অতীতে বারবার বলেছি, এবং আজ এই বিজয়মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি আবারও বলছি, আমাদের অবশ্যই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, জাতীয় এবং ডানপন্থী সরকার গঠন করতে হবে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ঠিক এটাই করা উচিত এবং আমরা সেটাই করব।” তার এই ঘোষণা থেকে এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, তিনি তার রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করতে মোটেও রাজি নন।
ইরানের ক্রমবর্ধমান হুমকি ও তা মোকাবিলার সুযোগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে নেতানিয়াহু এক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে গম্ভীরভাবে বলেন, “আমি আপনাদের সবাইকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই: আমাদের দীর্ঘদিনের অংশীদার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরান থেকে উদ্ভূত এই ভয়ানক অস্তিত্বের হুমকি চিরতরে দূর করার জন্য ইসরায়েল আজ এক ঐতিহাসিক, যা জীবনে একবারই আসে, এমন সুযোগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এটি আমাদের জন্য একটি পবিত্র মিশন। কোনো ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনা যেন আমাদের এই পবিত্র মিশন থেকে বিচ্যুত করতে না পারে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।” ভাষণের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে নেতানিয়াহু দেশবাসীকে চরমভাবে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন।
তিনি আত্মবিশ্বাসী ও তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলেন, “ইসরায়েলের সম্মানিত নাগরিকরা, পরিশেষে আমি আপনাদের সবাইকে শুধু এই কথাটিই বলতে চাই- আমরা অতীতে আমাদের সকল শত্রুদের ওপর চূড়ান্ত জয়লাভ করেছি, এবং একসঙ্গে আমরা ভবিষ্যতেও তাদের ওপর ঠিক একইভাবে জয়লাভ করব।”
সমাপনী এই বক্তব্য উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে এক অভাবনীয় উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে উৎসাহ জোগানোর জন্য এ সময় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে গান গাইতেও দেখা যায়।
এক আবেগঘন পরিবেশে তিনি তার সমর্থকদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গান, “বন্ধুরা, কেও ভয় পাবে না, কেও ভয় পাবে না।” দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চরম আশাবাদ ব্যক্ত করে নেতানিয়াহু তার এই ভাষণের সমাপ্তি টেনে বলেন, “বন্ধুরা, এটি কেবল সূচনা। কেবল সূচনা।”