বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের শর্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:১০ পিএম

পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের শর্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের
ছবি : File Photo

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, তিনি যখন চাইবেন, ঠিক তখনই ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত বা যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রকাশিত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যের কথা প্রকাশ্যে আনা হয়। ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার একক সদিচ্ছাতেই এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসান হতে পারে।

 

তবে এই সংঘাত চিরতরে বন্ধ করার আগে তেহরান প্রশাসনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট ও অলঙ্ঘনীয় শর্ত পূরণ করতে হবে। আর সেই প্রধান শর্তটি হলো, ইরানকে সম্পূর্ণ দ্বিধাহীনভাবে এই মর্মে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে হবে যে, তারা ভবিষ্যতে কখনোই কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা করবে না।

 

আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে চলমান জোরদার প্রচারণার অংশ হিসেবে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের লাবকে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যটি করেন।

 

জনসভায় উপস্থিত হাজারো সমর্থকের সামনে তিনি নিজের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক কৌশল নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে কথা বলেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি মূলত তার দেশীয় ভোটারদের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে চেয়েছেন।

 

নির্বাচনি প্রচারণার এই উন্মাদনাময় পরিবেশে ট্রাম্পের এই ধরনের বক্তব্য কেবল তার নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তিকেই মজবুত করার কৌশল নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও একটি সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা।

 

তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা বা যেকোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন কতটা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা রাখে।

 

টেক্সাসের ওই জনসভায় নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প দর্শকদের উদ্দেশ্যে একটি কাল্পনিক বা বাস্তব কথোপকথনের উদাহরণ টানেন। তিনি অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে বলেন, ‘সম্প্রতি কেউ একজন আমাকে অত্যন্ত কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আমাদের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষ কোথায় এবং এটি ঠিক কবে শেষ হবে?

 

আমি তাকে অত্যন্ত সরল ও সোজা ভাষায় উত্তর দিয়েছি যে, আমি যখন চাইব, ঠিক তখনই এই যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটবে।’ তার এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে তার নিজের ক্ষমতার প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং ইরান নীতিতে তার প্রশাসনের অনমনীয় অবস্থানের বিষয়টি অত্যন্ত প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।

 

তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই যুদ্ধের লাগাম সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনের হাতেই রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। তবে যুদ্ধ বন্ধের এই সদিচ্ছার পাশাপাশি ট্রাম্প অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটি রূপরেখাও প্রদান করেছেন।

 

তিনি তার বক্তব্যে আরও যোগ করে বলেন যে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত খুব দ্রুতই শেষ হতে পারে এবং তিনি নিজেও চান এটি দ্রুত শেষ হোক। কিন্তু এই সমাপ্তি অবশ্যই ‘যথাযথভাবে’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব শর্তাবলি মেনেই হতে হবে। আর সেই যথাযথ সমাপ্তির একমাত্র পূর্বশর্ত হলো পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ।

 

ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো, ইরান শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির আড়ালে অত্যন্ত সন্তর্পণে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি।

 

তাই ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির যেকোনো ধরনের গোপন বা প্রকাশ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে চিরতরে সরে আসতে হবে এবং বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, তারা কখনই এই ধরনের মারণাস্ত্রের অধিকারী হবে না।

 

এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক মূল্য নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে এরই মধ্যে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

 

এই বিশাল সামরিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও যথেষ্ট চাপের সৃষ্টি করেছে। করদাতাদের এই বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে সামরিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তার যৌক্তিকতা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতেও বিতর্ক রয়েছে।

 

ট্রাম্প মূলত তার ভোটারদের এই বার্তা দিতে চান যে, তিনি এই বিপুল ব্যয়ের সংঘাতকে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। তার লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, যেখানে ইরান আর কখনোই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক চরম বৈরিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হচ্ছে।

 

বিশেষ করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তেহরানের যে দীর্ঘস্থায়ী টানাপোড়েন, তা সাম্প্রতিক এই যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে এক চরম রূপ ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

 

ট্রাম্পের এই ঘোষণা মিত্র দেশগুলোর জন্য এক ধরনের স্বস্তির বার্তা বয়ে আনলেও, এটি তেহরানের জন্য একটি বিশাল কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ। ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের এই শর্ত মেনে নিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির ঘোষণা দেয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

 

অন্যদিকে, ইরানের নিজস্ব রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানও এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান প্রশাসন ঐতিহাসিকভাবেই পশ্চিমাদের এই ধরনের শর্ত বা আল্টিমেটামকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

 

ইরান সবসময়ই দাবি করে এসেছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো বেসামরিক কাজেই তা ব্যবহৃত হচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো অভিপ্রায় তাদের নেই বলে তারা বারবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকেও জানিয়ে এসেছে।

 

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অব্যাহত অবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার চরম সংকট বিরাজ করছে। এখন ট্রাম্পের এই সরাসরি শর্ত আরোপের পর ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটিই আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য একই সঙ্গে একটি চরম হুঁশিয়ারি এবং কূটনীতির একটি সূক্ষ্ম প্রস্তাব। তিনি একদিকে যেমন নিজের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে যুদ্ধ বন্ধের একটি পথও খোলা রেখেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি মূলত ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করার একটি সুকৌশলী চাপ প্রয়োগ।

 

যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান সম্পূর্ণ নিঃশর্তভাবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি গুটিয়ে নিক এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করুক। যদি ইরান এই শর্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্য থেকে এটিও পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতকে আরও প্রলম্বিত করতে এবং প্রয়োজনে সামরিক চাপ আরও বৃদ্ধি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।

 

মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বক্তব্যের গুরুত্ব অপরিসীম। নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি মার্কিন ভোটারদের কাছে অন্যতম প্রধান বিচার্য বিষয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেকে এমন একজন শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন, যিনি কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় আপসহীন।

 

টেক্সাসের মতো রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যে এই ধরনের জোরালো ও আগ্রাসী জাতীয়তাবাদী বক্তব্য ভোটারদের ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে। তিনি মূলত প্রমাণ করতে চাইছেন যে, পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলো নিরসনে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে তিনি চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই তার নিজের শর্তে একটি সফল পরিণতি বয়ে আনতে পারেন।

 

পরিশেষে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের শর্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের এই প্রস্তাব মূলত বিশ্ব কূটনীতিতে একটি নতুন মোড়। এখন পুরো বিশ্বের নজর তেহরানের দিকে।

 

ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম শর্ত মেনে নিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হবে, নাকি তারা নিজেদের আগের অবস্থানে অনড় থেকে সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, যতদিন পর্যন্ত পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল ইস্যুটির কোনো চূড়ান্ত ও স্থায়ী সমাধান না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির মেঘ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। মার্কিন প্রশাসনের এই অনড় অবস্থান এবং ইরানের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেবে।

 

- আল জাজিরা