এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত আংশিক ফলাফলে দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও প্রবীণ রাজনীতিক বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী ও রক্ষণশীল জোট অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলোর তুলনায় বেশ খানিকটা এগিয়ে রয়েছে।
তবে এই তাৎপর্যপূর্ণ প্রাথমিক অগ্রগতি সত্ত্বেও, একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনের জন্য নেসেট বা পার্লামেন্টে যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন, সেই ম্যাজিক ফিগার অর্জনের পথ এখনও নেতানিয়াহুর জন্য পুরোপুরি মসৃণ বা নিশ্চিত হয়নি।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের যে গভীর আদর্শিক মেরুকরণ ও সামাজিক বিভাজন বিরাজমান, এবারের নির্বাচনের এই খণ্ডিত আংশিক ফলাফলেও তার অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও নিপুণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্বের পরাশক্তিগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই নির্বাচনের প্রতিটি মুহূর্তের খবরের দিকে নজর রাখছে, কারণ এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ভবিষ্যৎই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার সমীকরণ বহুলাংশে নির্ভরশীল।
বুধবার, ২৮ অক্টোবর দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করা নির্বাচন-পরবর্তী পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে যে, এখন পর্যন্ত দেশব্যাপী মোট ২৮ লাখ ভোটারের ব্যালট অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গণনা করা সম্ভব হয়েছে।
গাণিতিক হিসাব ও পরিসংখ্যানের দিক থেকে এটি নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৫৬ শতাংশ। এর সোজা অর্থ হলো, এখনও প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোটের হিসাব চূড়ান্ত হওয়া বাকি রয়ে গেছে। এই বিশাল পরিমাণ অগণিত ভোট যেকোনো মুহূর্তে বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে পারে এবং জয়-পরাজয়ের পাশা উল্টে দিতে পারে।
তবে প্রাথমিক এই অর্ধেকের বেশি ভোট গণনার পর যে স্পষ্ট রাজনৈতিক চিত্রটি ফুটে উঠেছে, তাতে এটা নিশ্চিত যে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী, কট্টর জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় রক্ষণশীল মিত্রদের জোট আপাতত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুবিধাজনক অবস্থানে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অত্যন্ত সুরক্ষিত ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সারা দেশ থেকে আসা ব্যালট বাক্সগুলোর চূড়ান্ত গণনার কাজ বিরতিহীনভাবে চলছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব প্রাপ্ত ভোটের হারের দিকে গভীরভাবে নজর দিলে দেখা যায়, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী লিকুদ পার্টি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জনসমর্থনের দৌড়ে প্রথম স্থানে অবস্থান করছে।
দলটির প্রাপ্ত ভোটের বর্তমান হার ২০ দশমিক ৭ শতাংশ। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা নেতানিয়াহু দুর্নীতিসহ নানা আইনি জটিলতায় জর্জরিত থাকা সত্ত্বেও, নিজের কট্টরপন্থী ভোটব্যাংক ধরে রাখার ক্ষেত্রে যে এখনও সমাজে কতটা প্রভাবশালী, এই নির্বাচনী ফলাফল তারই এক অকাট্য প্রমাণ বহন করে।
অন্যদিকে, তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নির্বাচনী মাঠে অবতীর্ণ হওয়া দেশের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের সমর্থন আদায় করে নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইয়াশার পার্টি দেশের মধ্যপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ ভোটারদের একটি বিশাল অংশের মনোযোগ ও আস্থা আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
শীর্ষ এই দুই প্রবল প্রতিপক্ষ দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পাশাপাশি তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট ‘টুগেদার’। এই জোটটি এখন পর্যন্ত ৯ শতাংশ ভোট নিজেদের পক্ষে নিশ্চিত করে বর্তমান ইসরায়েলি রাজনীতিতে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব, অপরিহার্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করেছে।
ইসরায়েলের বর্তমান খণ্ডিত ও বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই ধরনের মাঝারি শক্তির দলগুলো অনেক সময় ‘কিংমেকার’ বা সরকার গঠনের প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে আবির্ভূত হয়।
নাফতালি বেনেট এর আগেও ঠিক এমন একটি রাজনৈতিক শূন্যতা ও জটিল পরিস্থিতির সুযোগ অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছিলেন। এবারের নির্বাচনেও তার দল সরকার গঠনের চূড়ান্ত সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের এই জটিল নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিটি শতাংশ ভোটের হিসাব অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ সামান্য ভোটের ব্যবধানও পার্লামেন্টের আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে বিশাল ও অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন নিয়ে আসতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী দৈনিক দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের বিশদ প্রতিবেদন ও আংশিক ফলাফলের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেসেট বা ইসরায়েলি পার্লামেন্টের মোট ১২০টি আসনের মধ্যে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট এখন পর্যন্ত ৫৫টি আসনে জয়লাভের পথে রয়েছে।
ইসরায়েলের সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, দেশটিতে একটি কার্যকরী ও বৈধ সরকার গঠন করতে হলে যেকোনো দল বা জোটকে পার্লামেন্টে কমপক্ষে ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হয়। সেই গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে এখনও ঠিক ৬টি আসন দূরে অবস্থান করছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু-বিরোধী বৃহত্তর জোটের ঝুলিতে এখন পর্যন্ত ৪৯টি আসন যাওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। বিরোধী এই রাজনৈতিক শিবিরটি মূলত নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার একমাত্র ও অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এক ছাতার নিচে সমবেত হয়েছে, যদিও তাদের নিজেদের মধ্যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক নীতিগত পার্থক্য আকাশ-পাতাল।
এবারের নির্বাচনের অন্যতম সবচেয়ে বড় চমক এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইসরায়েলের আরব বা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর অভাবনীয় উত্থান। আংশিক ফলাফলের পরিসংখ্যান বলছে, আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো এবারের নেসেট নির্বাচনে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৬টি আসন নিজেদের দখলে নিতে যাচ্ছে।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ হলো আরব নাগরিক, এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ দেশটির রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবেই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নির্ধারক বিষয়। অতীতে আরব দলগুলো সাধারণত পার্লামেন্টে বিরোধী আসনেই বসেছে এবং নীতিগত কারণে কোনো ক্ষমতাসীন ইহুদিবাদী জোটের অংশ হয়নি। কিন্তু এবার ১৬টি আসনের এই বিশাল ও ঐতিহাসিক অর্জন তাদেরকে বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় অভাবনীয় এক দরকষাকষির ক্ষমতার অধিকারী করে তুলেছে।
নেতানিয়াহুর কট্টর জোট বা তার বিরোধী জোট-যেই সরকার গঠন করতে চাক না কেন, তাদেরকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই আরব দলগুলোর সমর্থন বা অন্তত নীরব সম্মতির ওপর নির্ভর করতে হতে পারে, যা ইসরায়েলের কট্টর ইহুদিবাদী রাজনীতির জন্য এক অভূতপূর্ব, জটিল ও প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তা, বিভাজন ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিগত মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে বারবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্বাচিত সরকারই দেশের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বয়ে আনতে পারেনি।
নানা ধরনের মামলা ও রাজনৈতিক বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার প্রমাণ করেছেন যে তিনি ইসরায়েলের সবচেয়ে কৌশলী, অভিজ্ঞ ও হার না মানা রাজনৈতিক খেলোয়াড়। তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোটের এই প্রাথমিক সাফল্য তার সেই অতুলনীয় রাজনৈতিক দক্ষতারই এক নিখুঁত প্রতিফলন।
তবে, দেশের বড় শহরগুলোর ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক, উদারপন্থী মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং যারা দেশের বিচারব্যবস্থায় নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত বিতর্কিত সংস্কারের চরম বিরোধী, তারা এবার বিরোধী জোটকে অত্যন্ত জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন।
ফলে শহর ও গ্রামীণ জনপদ এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও কট্টরপন্থীদের মধ্যকার সামাজিক ব্যবধান ও ফাটল এই নির্বাচনের মাধ্যমে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের এই নির্বাচনের দিকে অত্যন্ত সতর্ক ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে।
বহুল আলোচিত ফিলিস্তিন ইস্যু, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করছে জেরুজালেমে শেষ পর্যন্ত নতুন কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সরকার ক্ষমতায় আসছে তার ওপর।
নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট যদি শেষ পর্যন্ত অন্যান্য সমমনা দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনে সফল হয়, তবে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতি আরও বেশি কঠোর ও অনমনীয় হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহল গভীরভাবে আশঙ্কা করছে।
অন্যদিকে, বিরোধী জোট যদি কোনোভাবে ক্ষমতায় আসতে পারে, তবে তারা হয়তো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কিছুটা নমনীয়, বাস্তববাদী ও সমন্বয়মূলক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করার চেষ্টা করতে পারে।
তবে এই সমস্ত সমীকরণ, জল্পনা ও পূর্বাভাসই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে বাকি থাকা ৪৪ শতাংশ ব্যালটের চূড়ান্ত ভোট গণনার ওপর। ইসরায়েলের অত্যন্ত জটিল আনুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় ছোট রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ভোট বা ‘ইলেক্টোরাল থ্রেশহোল্ড’ অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে নিয়ম অনুযায়ী তাদের পাওয়া সব ভোট বাতিল হয়ে যায় এবং আনুপাতিক হারে বড় দলগুলোর আসন সংখ্যা অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।
তাই ভোট গণনার একেবারে শেষ মুহূর্তটি পার না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা প্রায় অসম্ভব যে রাজনৈতিক এই দাবা খেলায় শেষ হাসি কে হাসবে। আগামী কয়েক দিন ইসরায়েলের রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা, নেপথ্যের গোপন আলোচনা এবং রাজনৈতিক জোট গঠনের এক অত্যন্ত জটিল ও শ্বাসরুদ্ধকর দরকষাকষি চলবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পুরো বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে ইসরায়েলের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের চূড়ান্ত রূপরেখা দেখার জন্য।