দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভেদ এবং আদর্শিক বৈরিতা দূরে সরিয়ে রেখে ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার মসনদ থেকে চিরতরে বিদায় করার লক্ষ্যে বিরোধী ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক জোট গঠনে প্রস্তুত থাকার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে দেশটির প্রধান ও সর্ববৃহৎ আরব রাজনৈতিক দল ‘জয়েন্ট লিস্ট’।
দলটির শীর্ষ নেতা এবং চেয়ারম্যান ইউসেফ জাবারিন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তাঁরা নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান ‘রক্তপাতের সরকারকে’ যেকোনো মূল্যে পরিবর্তন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলোর এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সূচনা করেছে, যা দেশটির ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে।
ইসরায়েলের জাতীয় পার্লামেন্ট, যা বিশ্বজুড়ে নেসেট নামে পরিচিত, মোট ১২০টি আসন নিয়ে গঠিত। দেশটির সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী, কোনো একক রাজনৈতিক দল বা একাধিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জোটকে যদি সরকার গঠন করতে হয়, তবে তাদেরকে পার্লামেন্টে অন্তত ৬১টি আসনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে।
কিন্তু এবারের নির্বাচনের চিত্র একেবারেই ভিন্ন এবং অত্যন্ত মেরুকৃত। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে নির্বাচনের প্রায় ৮৫ শতাংশ ভোট গণনার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত এই বিশাল অংশের ফলাফলের ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট পেতে যাচ্ছে ৫৪টি আসন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিন্ন লক্ষ্যে গঠিত গাদি আইজেনকোতের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ও বিরোধী জোট পেতে যাচ্ছে ৪৯টি আসন।
এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, বৃহৎ এই দুটি রাজনৈতিক জোটের কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ৬১ আসনের জাদুকরী মাইলফলক স্পর্শ করতে সক্ষম হয়নি।
ঠিক এই চরম রাজনৈতিক শূন্যতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবের কারণেই এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক ও সরকার গঠনের প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আরব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো। বর্তমান ফলাফল অনুযায়ী, আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৭টি আসন নিজেদের দখলে নিতে যাচ্ছে।
একক রাজনৈতিক দল হিসেবে আসন প্রাপ্তির দিক থেকে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ‘লিকুদ পার্টি’ প্রথম স্থানে এবং গাদি আইজেনকোতের ‘ইয়াশার পার্টি’ দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। আর এই প্রবল রাজনৈতিক দৌড়ে একক দল হিসেবে তৃতীয় সর্বোচ্চ আসন লাভ করার এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেছে আরব দল ‘জয়েন্ট লিস্ট’।
এই পরিসংখ্যান এটাই নিশ্চিত করে যে, বর্তমান অচলাবস্থায় আরব দলগুলোর প্রত্যক্ষ সমর্থন বা পরোক্ষ আইনি সহযোগিতা ব্যতীত কোনো ইহুদিবাদী জোটেরই একটি বৈধ ও স্থিতিশীল সরকার গঠনের ন্যূনতম কোনো গাণিতিক সম্ভাবনা অবশিষ্ট নেই।
এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জয়েন্ট লিস্টের চেয়ারম্যান ইউসেফ জাবারিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী বিবৃতি প্রদান করেছেন।
তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার করে বলেন, “নেতানিয়াহুর এই রক্তপাতের সরকারকে হটাতে আমি একটি সত্যিকারের ইহুদি-আরব জোটের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। বর্তমান বাস্তবতায় যাঁরাই একটি বিকল্প, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করতে চাইবেন, তাঁদের সকলকেই জয়েন্ট লিস্টের কাছে আসতে হবে।”
তাঁর এই বলিষ্ঠ বক্তব্য মূলত প্রমাণ করে যে, আরব রাজনৈতিক দলগুলো এখন আর নিজেদের প্রান্তিক বা অবহেলিত শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে না; বরং তারা রাষ্ট্রের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, নির্ধারক ও অংশীদারিত্বমূলক ভূমিকা পালন করতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।
তবে এই অভাবনীয় জোট গঠনের পথটি মোটেও মসৃণ বা বাধাহীন নয়। এবারের জাতীয় নির্বাচনের আগে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘকালীন শাসনের অবসান ঘটাতে ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি প্রধান বিরোধী ও মধ্যপন্থী ইহুদি রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলেছিল।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এই জোটটি ‘চেঞ্জ ব্লক’ বা পরিবর্তনের জোট নামে পরিচিতি লাভ করে। এই বহুল আলোচিত চেঞ্জ ব্লকের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান এবং ইয়াশার পার্টির শীর্ষ নেতা গাদি আইজেনকোত।
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তিনি অন্যান্য ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত সফলভাবে ঐক্যমতে পৌঁছাতে সক্ষম হলেও, আরব দলগুলোর বিষয়ে তাঁর পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনমনীয়।
নির্বাচনের আগে গাদি আইজেনকোত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, সরকার গঠন বা অন্য কোনো রাজনৈতিক প্রয়োজনে তিনি আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট গঠন করবেন না। তাঁর সেই কঠোর আদর্শিক অবস্থানই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী জোটের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
কিন্তু নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের আভাস পাওয়ার পর বিরোধী এই ‘চেঞ্জ ব্লকের’ ভেতরেই এখন কৌশলগত পরিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক চিন্তাধারার উদ্ভব হতে শুরু করেছে। এই ব্লকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক দল ‘ডেমোক্র্যাট পার্টি’ বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে আরবদের সঙ্গে জোট গঠনের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো ও প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণ করেছে।
দলটির শীর্ষ নেতাদের মতে, দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে পরিবর্তন করার জন্য বিরোধী শিবিরের সামনে এখন এক ঐতিহাসিক ও বিশাল সুযোগ এসে উপস্থিত হয়েছে। যদি আদর্শিক গোঁড়ামির কারণে এই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য এক চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ডেমোক্র্যাট পার্টির মতে, এই দুর্লভ সুযোগটিকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগানোর জন্য এবং দেশের বৃহৎ স্বার্থে একটি কার্যকরী বিকল্প সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ইহুদি দলগুলোর উচিত অবিলম্বে আরব দলগুলোর সঙ্গে একটি অর্থবহ ও সমঝোতামূলক রাজনৈতিক জোট গঠন করা।
ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আপস ও সমঝোতা ছাড়া কোনো পক্ষই সামনে অগ্রসর হতে পারবে না। গাদি আইজেনকোত এবং তাঁর জোটের শরিকদের এখন একটি অত্যন্ত কঠিন, তিক্ত কিন্তু বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
যদি বিরোধী দলগুলো তাদের পূর্বের অনমনীয় আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে এসে আরব দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে নেতানিয়াহু-বিরোধী বিকল্প সরকার গঠনের সমস্ত সম্ভাবনা চিরতরে ভেস্তে যাবে।
আর আরবদের সমর্থন ছাড়া যেহেতু কোনো পক্ষই ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারবে না, তাই ইসরায়েলের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী দেশটিকে বাধ্য হয়ে পুনরায় একটি ব্যয়বহুল, অনিশ্চিত ও তিক্ততাপূর্ণ নতুন সাধারণ নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব নাগরিকদের এই অভূতপূর্ব উত্থান এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ কেবল ক্ষমতার পালাবদলের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি মূলত প্রমাণ করছে যে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সচেতনতা কীভাবে গোটা রাষ্ট্রের ক্ষমতার সমীকরণকে মুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
এখন পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং ইসরায়েলের আপামর জনসাধারণ অত্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোত শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে মাথা নত করে আরবদের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক জোটে সম্মত হন কি না, এবং ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত নতুন সরকারের মুখ দেখতে পায় নাকি আরেকটি নির্বাচনের দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় নিপতিত হয় তা দেখার জন্য।