বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৬
১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলে ভোট গণনা প্রায় সম্পন্ন, সরকার গঠন নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক অচলাবস্থা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৭ এএম

ইসরায়েলে ভোট গণনা প্রায় সম্পন্ন, সরকার গঠন নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক অচলাবস্থা
ছবি : Collected

সদ্য সমাপ্ত ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের ভোট গণনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেলেও, ক্ষমতার চূড়ান্ত চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে, তা নিয়ে দেশটিতে এখনও চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

 

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট অর্ধেকের বেশি ভোট নিশ্চিত করতে সক্ষম হলেও, পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য যে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ মেলানো প্রয়োজন, তা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ফলে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নাকি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট-কে আগামী দিনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন, সেটি এখনও সম্পূর্ণ অস্পষ্ট রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরই মধ্যে সারা দেশের প্রায় নব্বই শতাংশ ভোট গণনার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

 

অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যই নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

 

বুধবার পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, প্রায় ছিয়াশি শতাংশ ভোট গণনা শেষে ইসরায়েলের প্রধান তিনটি সম্প্রচারমাধ্যম তাদের বুথফেরত জরিপ ও প্রাথমিক ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তাতে এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার ইঙ্গিত আরও সুস্পষ্ট হয়েছে।

 

সংবাদমাধ্যমগুলোর পূর্বাভাস অনুসারে, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী, কট্টর ডানপন্থী এবং অতি-রক্ষণশীল অর্থোডক্স দলগুলোর শক্তিশালী জোট ইসরায়েলের পার্লামেন্ট বা নেসেটে ৫৩টি আসন লাভ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

ইসরায়েলের ১২০ আসনবিশিষ্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য কমপক্ষে ৬১টি আসনের প্রয়োজন হয়, যা থেকে নেতানিয়াহুর জোট এখনও বেশ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার একক লক্ষ্য নিয়ে গঠিত গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৮টি আসন।

 

এই বিরোধী জোটে কেন্দ্র-বাম থেকে শুরু করে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ রয়েছে। নির্বাচন-পূর্ববর্তী বিভিন্ন জরিপে এই জোট যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিয়েছিল, বাস্তব ফলাফলে তারা সেই প্রত্যাশা পূরণে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক এবং নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আরব ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো। ধারণা করা হচ্ছে যে, এই দলগুলো নেসেটে রেকর্ড সংখ্যক ১৯টি আসন নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হবে।

 

ইসরায়েলের বর্তমান জটিল রাজনৈতিক সমীকরণে এই ১৯টি আসন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের ক্ষমতায় আসার জন্য আরব দলগুলোর এই বিশাল সমর্থন অত্যন্ত জরুরি।

 

কারণ তাদের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়া আইজেনকোটের পক্ষে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের কাঙ্ক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্পর্শ করার কোনো বাস্তবসম্মত পথ খোলা নেই। তবে ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত।

 

অনেক শীর্ষস্থানীয় ইহুদি রাজনৈতিক নেতা আরব ইসরায়েলি দলগুলোর সমর্থন গ্রহণ বা তাদের সাথে জোট গঠনের সম্ভাবনাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে আইজেনকোটের জন্য এই সমীকরণ মেলানো কার্যত এক অসম্ভব ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক দল লিকুদ পার্টি ইতিমধ্যেই প্রকাশ্য অভিযোগ তুলেছে যে, আরব দলগুলো নির্বাচনে কারচুপি বা ভোট চুরির আশ্রয় নিয়েছে, যা নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।

 

ইসরায়েলের সাংবিধানিক নিয়ম এবং সরকার গঠনের আইনি কাঠামো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং পর্যায়ক্রমিক। কোনো একক রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর অথবা প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করার পর, সেই দল বা জোটের শীর্ষ নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

 

প্রেসিডেন্টের সাথে সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় বিজয়ী দল বা জোটের কোন নেতা নতুন সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। প্রেসিডেন্ট যখন সম্পূর্ণ নিশ্চিত হন যে কোনো নির্দিষ্ট নেতার সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক সমর্থন রয়েছে, তখন তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয়।

 

এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের জন্য তাকে বিয়াল্লিশ দিন সময় প্রদান করা হয়। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনীত নেতাকে বিভিন্ন ছোট-বড় দলের সাথে নিবিড় দরকষাকষি করে একটি স্থিতিশীল কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠন করতে হয়।

 

বর্তমান বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, বিজয়ী দল বা জোট যদি নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি বা নীতিগত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে পুনরায় নতুন নির্বাচনের আয়োজন করার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

 

ইসরায়েলের অস্থিতিশীল রাজনীতিতে এই ধরনের অচলাবস্থা নতুন কিছু নয়; গত কয়েক বছরে দেশটিকে বেশ কয়েকবার এমন তিক্ত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে না পারে এবং নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে স্বাভাবিক নিয়মেই পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

 

যদিও তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, তবুও ইহুদি ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছ থেকে তিনি যে অপ্রত্যাশিত এবং জোরালো সমর্থন পেয়েছেন, তা তাকে পুরোপুরি ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনাকে অত্যন্ত ক্ষীণ করে দিয়েছে।

 

ইসরায়েলের শাসনতান্ত্রিক আইন অনুযায়ী একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদকাল নির্ধারিত থাকে না। নতুন একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই সরকারই পূর্ণাঙ্গভাবে দেশ পরিচালনা করে।

 

যেকোনো জোট গঠনের দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার সময়কালে এবং সম্ভবত আগামী বছরের পরবর্তী সম্ভাব্য নির্বাচন পর্যন্ত নেতানিয়াহুই অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসীন থাকবেন বলে বেশিরভাগ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক একমত পোষণ করেছেন।

 

যদিও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর বেশ কিছু আইনি, কাঠামোগত এবং নৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকে, তবুও শাসনতান্ত্রিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সরকারের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যথেষ্ট এবং অত্যন্ত কার্যকর ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে।

 

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নেতানিয়াহু যদিও একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, তবুও তিনি এবং তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল এবং কৌশলগত বিষয়গুলোর ব্যাপারেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ আইনি অধিকার রাখেন।

 

এই তাৎপর্যপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর বিষয়ে ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের প্রখ্যাত রিসার্চ ফেলো গাই লুরি একটি গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তার মতে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা মূলত সাধারণ নির্বাচিত সরকারের মতোই বিস্তৃত ও শক্তিশালী থাকে।

 

তবে তাদের ওপর একটি অলিখিত ‘সংযম প্রদর্শনের দায়িত্ব’ বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা বর্তায়, কারণ তারা জনগণের প্রত্যক্ষ ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কিছুটা সীমিত থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় জরুরি পরিস্থিতিতে তারা যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয় না।

 

এদিকে সাধারণ নাগরিকদের, বিশেষ করে ফিলিস্তিনি বা গাজাবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি এই নির্বাচনে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মতে, নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট-এই দুই নেতার রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে বাহ্যিক কিছু পার্থক্য থাকলেও, বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দুজনের অবস্থান প্রায় অভিন্ন।

 

ফিলিস্তিনিদের কাছে এই নির্বাচন অনেকটা দুই অমঙ্গলের মধ্যে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর দিকটি বেছে নেওয়ার মতো একটি বাধ্যবাধকতা। পরিশেষে বলা যায়, ইসরায়েলের এই সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন দেশটিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে পর্দার আড়ালের দরকষাকষি শুরু হবে, তা মূলত ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলো এবং পশ্চিমা বিশ্ব অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

 

একটি স্থিতিশীল সরকার ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়া, ফিলিস্তিন ইস্যু এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কূটনীতি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রয়টার্স এবং আলজাজিরার মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত এই রাজনৈতিক নাটকের সর্বশেষ খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

 

এখন কেবল অপেক্ষার পালা, শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই চরম অচলাবস্থা নিরসন করে একটি নতুন ও কার্যকর সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, নাকি দেশটিকে রাজনৈতিক মেরুকরণের বলি হয়ে আরও একবার নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

 

- রয়টার্স, আলজাজিরা