বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৬
১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি পরাস্ত হননি নেতানিয়াহু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৩ এএম

নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি পরাস্ত হননি নেতানিয়াহু
ছবি : File Photo

সদ্য সমাপ্ত ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এবং জটিল রাজনৈতিক চিত্র ফুটে ওঠে। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবারের নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হলেও, তাকে পুরোপুরি পরাস্ত বা রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ভাবার কোনো যৌক্তিক অবকাশ নেই।

 

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক গভীর বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সমীকরণের বিষয়টি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে। নির্বাচনের আগে ও পরে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চাল এবং ইসরায়েলি ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, তিনি আসন হারালেও নিজের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রভাব সুদৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

 

এই নির্বাচন কেবল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং চলমান সংঘাতের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

 

নির্বাচনের প্রচারণাকালে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অত্যন্ত সুকৌশলে এবং সুপরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আখ্যান তৈরি করেছিলেন, যা ইহুদি ভোটারদের একটি বিশাল এবং প্রভাবশালী অংশের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

 

তার মূল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক প্রস্তাবনা ছিল চলমান সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধ অব্যাহত রাখা এবং দেশের অভ্যন্তরে অনির্দিষ্টকালের জন্য জরুরি অবস্থা বজায় রাখা। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে সাধারণ ভোটারদের মনে এই বার্তাটি গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছেন যে, দেশের বর্তমান ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা এবং আঞ্চলিক হুমকি কাটিয়ে ওঠার জন্য তার মতো একজন শক্তিশালী, অভিজ্ঞ এবং যুদ্ধংদেহী নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।

 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামাসের নজিরবিহীন এবং আকস্মিক হামলার পর নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশি-বিদেশি মহলে যে গভীর সংশয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে সেই ব্যর্থতার সার্বিক দায়ভার সম্পূর্ণ নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে সামরিক বাহিনীর ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

 

নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান এবং কার্যকর হাতিয়ার ছিল ৭ অক্টোবরের মর্মান্তিক ঘটনার একটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করা। তিনি বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় এবং ভোটারদের উদ্দেশ্যে জোরালোভাবে দাবি করেছেন যে, হামাসের সেই ভয়াবহ হামলার পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনো প্রকার গাফিলতি বা ব্যর্থতা ছিল না।

 

বরং এর সম্পূর্ণ দায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের অপরিণামদর্শিতা। তার ভাষ্যমতে, সামরিক বাহিনীর চরম গাফিলতি এবং গোয়েন্দা ব্যর্থতার পর যখন গোটা দেশের অস্তিত্ব এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছিল, ঠিক তখনই তিনি জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সামনে এগিয়ে এসেছিলেন।

 

নেতানিয়াহু অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেন যে, তার বলিষ্ঠ, আপসহীন এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই ইসরায়েল আজ ৭ অক্টোবরের আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ এবং সুরক্ষিত একটি সামরিক অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।

 

সাধারণ ভোটারদের মধ্যে, বিশেষ করে উগ্র-ডানপন্থী, জাতীয়তাবাদী এবং রক্ষণশীল ইহুদি নাগরিকদের মাঝে তার এই বক্তব্য ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। দেশের একটি বড় অংশ বাস্তবেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে নতুন কাউকে ক্ষমতা দেওয়া চরম আত্মঘাতী একটি সিদ্ধান্ত হতে পারে।

 

তবে এসব কৌশলগত এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার পরও চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফলের পরিসংখ্যান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক বা আনন্দদায়ক নয়। বস্তুত, ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় এবার নেতানিয়াহু এবং তার মিত্র ডানপন্থী দলগুলো বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন হারিয়েছে।

 

প্রাথমিক ফলাফল এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার নেতৃত্বাধীন উগ্র-ডানপন্থী এবং অতি-রক্ষণশীল জোট গতবারের তুলনায় পার্লামেন্টে প্রায় আট থেকে দশটি আসন খুইয়েছে। ইসরায়েলের ১২০ আসনবিশিষ্ট নেসেট বা আইনসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের যে জাদুকরী সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হয়, তা অর্জন করতে তার জোট এবার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

 

কিন্তু এই আপাত ব্যর্থতার মধ্যেও নেতানিয়াহু একটি অনেক বড় কৌশলগত এবং রাজনৈতিক বিজয় হাসিল করেছেন। তিনি তার বিরোধী পক্ষের তথাকথিত পরিবর্তনের প্রচারণা চালানো মধ্যপন্থী এবং বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীটিকেও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে নিবৃত্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।

 

অর্থাৎ, বিরোধীরাও যাতে কোনোভাবেই সরকার গঠন করতে না পারে এবং তারা যাতে সংখ্যালঘু একটি খণ্ডিত জোটে আটকে থাকে, সেই জটিল সংসদীয় সমীকরণ মেলাতে তিনি শতভাগ সফল হয়েছেন। এর ফলে দেশটিতে আবারও একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অচলাবস্থা বা ঝুলন্ত পার্লামেন্টের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

 

ইসরায়েলের সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী এখন একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে দেশটিকে। কোনো দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির প্রেসিডেন্ট এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন এবং যার পক্ষে সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করবেন।

 

কিন্তু বর্তমান মেরুকরণ এবং রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে কোনো একক নেতার পক্ষেই একটি স্থিতিশীল কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

 

একটি শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল সরকারের অভাবে ইসরায়েল কীভাবে তার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিপর্যস্ত অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি মোকাবিলা করবে, তা নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। পশ্চিমা মিত্ররা আশঙ্কা করছে যে, এই রাজনৈতিক শূন্যতা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত এবং জটিল করে তুলতে পারে।

 

এই নির্বাচনের সবচেয়ে বিস্ময়কর, ইতিবাচক এবং দীর্ঘমেয়াদী তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো ফিলিস্তিনি বা আরব-ইসরায়েলি প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর অভাবনীয় এবং চমকপ্রদ সাফল্য।

 

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ জোট বা জয়েন্ট লিস্ট এবারের নির্বাচনে যে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে, তা ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। যুগ যুগ ধরে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকরণ ও বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকা আরব নাগরিকরা এবার বিপুল উৎসাহ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন।

 

জয়েন্ট লিস্টের পাশাপাশি মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল রাম তুলনামূলক কম আসন পেলেও, তাদের অগ্রগতিও রাজনীতিতে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। এই ফিলিস্তিনি দলগুলোর অভাবনীয় উত্থান দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতিতে আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা, অধিকারবোধ এবং নীতিনির্ধারণী প্রভাব ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে।

 

পরিশেষে ফিলিস্তিনি দলগুলোর এই ঐতিহাসিক সাফল্য ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের সমীকরণকে আরও অনেক বেশি জটিল, স্পর্শকাতর এবং কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে। নেতানিয়াহু এবং তার উগ্র-ডানপন্থী জোটের মিত্ররা তাদের আদর্শিক কারণে কোনোভাবেই আরব দলগুলোকে সরকারে বা মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি নয়।

 

অন্যদিকে বিরোধী জোটেরও নিজেদের শক্তিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের কোনো সুযোগ নেই। ফলে জয়েন্ট লিস্ট এবং রাম দলের হাতেই এখন পরোক্ষভাবে সরকার গঠনের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি বা নিয়ন্ত্রক শক্তি চলে এসেছে।

 

রয়টার্স, বিবিসি এবং আল জাজিরার মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত এই রাজনৈতিক নাটকের এবং অচলাবস্থার সর্বশেষ আপডেট বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। একদিকে নেতানিয়াহুর যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার নিরলস রাজনৈতিক প্রচেষ্টা এবং অন্যদিকে বিরোধী ও ফিলিস্তিনি দলগুলোর অভাবনীয় উত্থান সব মিলিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতি এখন এক চরম এবং চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

এই নির্বাচন গোটা বিশ্বকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হয়তো অতীতের মতো একক এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী কোনো নেতা নেই, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি নামক এই নির্মম দাবা খেলায় তিনি এখনও একজন দুর্ধর্ষ এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড়, যাকে পরাস্ত করা বিরোধীদের জন্য এক প্রায় অসম্ভব চ্যালেঞ্জ।

 

- মিডল ইস্ট আই