মঙ্গলবারের এই বহুল আলোচিত নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এই জটিল এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে যদি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হওয়া আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো প্রকার গঠনমূলক সমঝোতা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকেই ফের একটি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন নতুন সরকার গঠন করতে হবে।
সাংবিধানিক বিধি অনুযায়ী, এই অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান এবং একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফের একটি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করা। তবে এই সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে আন্তর্জাতিক মিত্রদের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে বেশ কিছু সুস্পষ্ট এবং কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যদি নেতানিয়াহুকে সত্যিই একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হয়, তবে সেই মন্ত্রিসভায় তার দীর্ঘদিনের দুই মিত্র ইতামার বেন গিভির এবং বেজালেল স্মোতরিচকে দেখতে একেবারেই আগ্রহী নন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতামার বেন গিভির এবং বেজালেল স্মোতরিচ অত্যন্ত পরিচিত এবং একইসঙ্গে বিতর্কিত দুটি নাম। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সর্বশেষ মেয়াদের মন্ত্রিসভায় এই দুই কট্টর ডানপন্থি নেতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল পদে আসীন ছিলেন।
ইতামার বেন গিভির দায়িত্ব পালন করেছেন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে, যার ওপর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার মূল ভার ন্যস্ত ছিল। অন্যদিকে, বেজালেল স্মোতরিচ দেশটির অর্থমন্ত্রীর মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতিনির্ধারণী পদের দায়িত্বে ছিলেন।
এই দুই নেতাই তাদের উগ্র-জাতীয়তাবাদী এবং চরমপন্থি রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য বিশ্বজুড়ে সমালোচিত। গত কয়েক বছরে ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীর অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে তারা প্রকাশ্যেই বেশ কয়েকবার উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন এবং তাদের ইন্ধনে ওই অঞ্চলে চরম উত্তেজনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার অভিযোগ করে আসছে।
শুধু পশ্চিম তীরেই নয়, এই দুই ডানপন্থি নেতার চরমপন্থি অবস্থানের প্রভাব গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের ক্ষেত্রেও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের নজিরবিহীন ও আকস্মিক জঙ্গি হামলার পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ গাজা উপত্যকায় যে সর্বাত্মক, ধ্বংসাত্মক এবং রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তা থামানোর পথে এই দুই নেতাই সবচেয়ে বড় এবং অনতিক্রম্য বাধা হিসেবে কাজ করেছেন।
যখনই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মিত্র দেশগুলো এবং মধ্যস্থতাকারীরা গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য নেতানিয়াহু সরকারের ওপর প্রবল চাপ প্রয়োগ করেছে, তখনই বেন গিভির এবং স্মোতরিচ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন এবং সরকার থেকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়ে নেতানিয়াহুকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছেন।
তাদের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণেই গাজায় শান্তি প্রক্রিয়া বারবার হোঁচট খেয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এমন একাধিক নির্ভরযোগ্য মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল্লা’ একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
হিব্রু ভাষার এই প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমটি মূলত ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান এবং জাতীয় দৈনিক 'দ্য জেরুজালেম পোস্ট'-এর একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। মার্কিন কূটনৈতিক সূত্রগুলো সংবাদমাধ্যম ওয়াল্লাকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইতামার বেন গিভির এবং বেজালেল স্মোতরিচের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে কট্টরপন্থি বসতি স্থাপনকারীদের লক্ষ্য করে যে ধারাবাহিক ও ভয়াবহ সহিংসতা চলছে, তা পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদী শান্তি পরিকল্পনাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই দুই নেতার উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড তার মধ্যপ্রাচ্য নীতির সরাসরি পরিপন্থি। সূত্রগুলো আরও বিশদভাবে জানিয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতে গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ নিয়ে তার যে নিজস্ব কৌশলগত পরিকল্পনা রয়েছে, তা এই কট্টরপন্থিদের কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়াও, ইসরায়েলের সঙ্গে আরবের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরির লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তি ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর সম্প্রসারণ ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য।
ইসরায়েল এবং বৃহত্তর আরব বিশ্বের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে যুগান্তকারী প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেছিলেন, পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান এবং লাগামহীন সহিংসতার কারণে সেই সবকিছু আজ প্রবল ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জাতিসংঘের প্রকাশিত সাম্প্রতিক এবং উদ্বেগজনক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের এই সহিংসতা সর্বকালের রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের মিত্রদের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনামলে ইসরায়েলকে একচেটিয়া সমর্থন দিলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহত্তর স্থিতিশীলতা দেখতে চান। তার মেয়াদে স্বাক্ষরিত 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস' ছিল একটি যুগান্তকারী চুক্তি, যার মাধ্যমে বেশ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল যে, ভবিষ্যতে প্রভাবশালী আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোও এই চুক্তিতে যুক্ত হবে। কিন্তু ইতামার বেন গিভির এবং বেজালেল স্মোতরিচের মতো কট্টরপন্থি নেতারা যেভাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য রাখছেন এবং ফিলিস্তিনিদের জমি দখলের ইন্ধন যোগাচ্ছেন, তাতে মধ্যপন্থী আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ থেকে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এই দুই নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তার নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্য সরাসরি হুমকি বলে বিবেচিত হচ্ছে। এদিকে, মঙ্গলবারের নির্বাচনের ফলাফলে ইসরায়েলের রাজনীতি যে কতটা বিভক্ত এবং মেরুকৃত, তা একেবারে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী জোট অথবা সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট-কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন অর্জন করতে পারেনি।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত এবং গণনা করা ভোটের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ১২০ আসন বিশিষ্ট ইসরায়েলি পার্লামেন্ট বা নেসেটে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট ৫৩টি আসনে জয়ী হতে চলেছে। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৮টি আসন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং নির্ণায়ক বিষয়টি হলো, আরব ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো এবার রেকর্ড ১৯টি আসনে জয়ী হতে পারে বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে। এই অভাবনীয় আসনসংখ্যার কারণে আরব দলগুলো এখন ইসরায়েলের রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই 'কিংমেকার' বা ভাগ্য নির্ধারক এবং নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
তাদের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়া কোনো জোটেরই সরকার গঠনের কোনো বাস্তবসম্মত সুযোগ নেই। এই রাজনৈতিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশটির প্রধান বামপন্থী দলের শীর্ষ নেতা ইয়ার গোলান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটকে অত্যন্ত জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
গোলানের সুস্পষ্ট প্রস্তাব হলো, যেকোনো মূল্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে একটি নীতিগত জোট বেঁধে এবং তাদের রাজনৈতিক দাবিদাওয়া মেনে নিয়ে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে চূড়ান্তভাবে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন, কারণ বিরোধী জোটের ভেতরেও তীব্র আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং মতানৈক্য রয়েছে।
এরই মাঝে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটটি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যাওয়ার প্রবল সম্ভাব্যতাও দেখা দিয়েছে, যা ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন এক নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী জোটের অন্যতম শীর্ষ ডানপন্থি নেতা আভিগদোর লিবারম্যান এবং তার কট্টরপন্থি দল 'ইসরায়েল বেইতেনু' জোটের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের জেরে নেতানিয়াহুর জোটে যোগ দিতে পারেন বলে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
যদি লিবারম্যান সত্যিই নেতানিয়াহুর শিবিরে যোগ দেন, তবে রাজনৈতিক সমীকরণ আবার পাল্টে যেতে পারে এবং নেতানিয়াহু কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসতে পারেন। সব মিলিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার সুতোয় ঝুলছে।
একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে সেখানে ট্রাম্পের অপছন্দের বেন গিভির ও স্মোতরিচ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন এবং তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষকদের মূল আগ্রহের বিষয়।