শুক্রবার, অক্টোবর ৩০, ২০২৬
১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে: ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম

শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে: ইরান
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত কঠোর এবং দ্ব্যর্থহীন বার্তা প্রদান করা হয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বা আইআরজিসি-র উপপ্রধান মেজর জেনারেল মোস্তফা ইযাদি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট শর্তসমূহ সম্পূর্ণভাবে পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে।

 

পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের মিত্রদের নানামুখী চাপের মুখেও নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের নিজস্ব জলসীমা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।

 

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে ইসলামি যোদ্ধাদের হাতে রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বা বৈরী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে এই প্রণালি উন্মুক্ত থাকার বিষয়ে যে ধরনের দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে, তাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে মেজর জেনারেল ইযাদি জানিয়েছেন যে, শত্রুপক্ষের এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের কোনো বাস্তবতা নেই।

 

যতদিন পর্যন্ত ইরানের যৌক্তিক এবং ন্যায্য দাবিগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মেনে না নেবে, ততদিন এই জলপথের ওপর ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে। দেশের সামরিক প্রস্তুতি এবং বহিঃশত্রুর যেকোনো ধরনের আগ্রাসন মোকাবিলার সক্ষমতা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আইআরজিসি-র এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন যে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত।

 

শত্রুপক্ষ যদি মধ্যপ্রাচ্যে বা ইরানের ভৌগোলিক সীমানার আশপাশে কোনো ধরনের দুঃসাহসিক বা অবিবেচনাপ্রসূত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তার অত্যন্ত কঠিন এবং তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার জন্য ইরানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

 

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইরানের সামরিক শক্তি কেবল আধুনিক সমরাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এ দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যক্ষ যুদ্ধের এক বিশাল এবং সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা।

 

সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি দেশের আপামর জনসাধারণ যেকোনো জাতীয় সংকটে যেভাবে ইস্পাতকঠিন ঐক্য নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, সেটিই ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় এবং অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে কাজ করে।

 

ইতিহাসের পাতা থেকে দৃষ্টান্ত তুলে ধরে মেজর জেনারেল মোস্তফা ইযাদি আট বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের সময় তৎকালীন ইরাকের বাথ শাসকগোষ্ঠীকে মদদ দেওয়ার জন্য পূর্ব ও পশ্চিমের সমস্ত বৈশ্বিক পরাশক্তি এবং আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রগুলো একজোট হয়েছিল।

 

ইরানের বিরুদ্ধে তারা সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র, বিপুল অর্থ এবং নিরবচ্ছিন্ন লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করেছিল। কিন্তু এত বিশাল আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং অসম সামরিক শক্তির মুখেও ইরানের স্বাধীনচেতা জনগণ এবং সশস্ত্র বাহিনী এমন এক অভাবনীয় এবং দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল যা সারা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল।

 

সেই অবিস্মরণীয় প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত শত্রুপক্ষ পরাস্ত হতে বাধ্য হয়েছিল এবং তারা নতি স্বীকার করেছিল। এই ঐতিহাসিক বিজয় প্রমাণ করে যে, কেবল বাহ্যিক সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে একটি জাতির স্বাধীনতাস্পৃহা এবং আত্মমর্যাদাবোধকে কখনোই দমিয়ে রাখা যায় না।

 

অতীতের সেই আট বছরের যুদ্ধের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ের আরও কিছু তাৎপর্যপূর্ণ সংঘাতের কথাও তিনি তার বক্তব্যে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। বিশেষ করে বারো দিন এবং চল্লিশ দিনের যে যুদ্ধগুলো ইরানের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই আরোপিত যুদ্ধগুলোতেও ইরানের সচেতন এবং দেশপ্রেমিক জনগণ মাঠে নেমে যে বীরত্বপূর্ণ এবং অকুতোভয় ভূমিকা পালন করেছে, তা সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

 

প্রতিটি চাপিয়ে দেওয়া সংঘাতে ইরানের সাধারণ মানুষ এবং সামরিক বাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেছে। তাদের এই সর্বাত্মক এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রতিরোধের কারণে শত্রুপক্ষ রণক্ষেত্রে এমন এক চরম এবং শোচনীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচাতে এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে তারা নিজেরাই যুদ্ধবিরতির জন্য বারবার অনুরোধ করতে বাধ্য হয়েছিল।

 

আইআরজিসি-র এই উপপ্রধান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, ইরান তার সশস্ত্র বাহিনী এবং বিপ্লবী জনগণের সম্মিলিত শক্তির ওপর ভর করে আজও সেই একই বিজয়মুখী এবং গৌরবোজ্জ্বল পথ ধরে সামনের দিকে অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

ভবিষ্যতের যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাত বা যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে মেজর জেনারেল ইযাদি বলেন, শত্রুপক্ষ হয়তো তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করতে পারে বা বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

 

কিন্তু চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এই ধরনের যেকোনো যুদ্ধে বিজয়ের মুকুট তাদের মাথাতেই উঠবে যারা ন্যায়, সত্য এবং নিজেদের মাতৃভূমির অস্তিত্ব রক্ষায় অবতীর্ণ হয়। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, যারা নিজেদের জাতীয় সম্মান, পবিত্র ধর্ম, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, নিজস্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐক্য রক্ষায় জীবন বাজি রেখে লড়াই করে, তাদের পরাস্ত করার মতো কোনো শক্তি এই পৃথিবীতে নেই।

 

ইরানের যোদ্ধাদের মনস্তাত্ত্বিক শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস হলো তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, যেখানে তারা দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার বা শাহাদাত বরণ করাকে নিজেদের জীবনের এক মহাসাফল্য এবং চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করে।

 

এই আদর্শিক শক্তির কারণেই শত্রুর যেকোনো অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ইরানের যোদ্ধাদের অটুট মনোবল ভাঙতে চরমভাবে ব্যর্থ হবে। রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের বিষয়ে আশ্বস্ত করে তিনি দেশবাসীকে জানান যে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব, পবিত্রতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর দৃঢ়ভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

 

এই প্রস্তুতি কেবল মানসিক বা আদর্শিক নয়, বরং প্রযুক্তিগত এবং কৌশলগত দিক থেকেও ইরান নিজেদের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অবরোধ এবং নানামুখী অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও ইরান সামরিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে।

 

বিশেষ করে বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা বা ডেটারেন্স বজায় রাখার পাশাপাশি সামরিক প্রযুক্তিতে তারা ব্যাপক উৎকর্ষ সাধন করেছে। ভূমি থেকে ভূমিতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম দূরপাল্লার নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, শত্রুর যেকোনো আকাশযান ধ্বংস করতে সক্ষম অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বর্তমান আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত ড্রোন বা মনুষ্যবিহীন আকাশযান প্রযুক্তিতে ইরান যে অসামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা আজ সারা বিশ্বে স্বীকৃত।

 

নিজস্ব মেধা এবং প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে তারা শুধু নিজেদের হৃত সক্ষমতাই পুনরুদ্ধার করেনি, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। পরিশেষে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মেজর জেনারেল মোস্তফা ইযাদির এই বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

 

হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং কৌশলগতভাবে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ইরানের এই অনড় অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

 

একই সাথে, নিজেদের সামরিক শক্তির মহড়া এবং অতীত যুদ্ধের বিজয়ের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইরান মূলত পশ্চিমা শক্তিগুলোকে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, কোনো ধরনের সামরিক উসকানি বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে তেহরানকে তার মৌলিক নীতি এবং শর্ত থেকে একচুলও সরানো যাবে না।

 

শর্তহীনভাবে এবং পূর্ণাঙ্গরূপে ইরানের দাবিগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মেনে নিতে হবে, অন্যথায় হরমুজ প্রণালিসহ সমগ্র অঞ্চলে ইরানের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক সতর্কতা নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে।

 

- পার্সটুডে