তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ইরানের ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের দীর্ঘদিনের অনুসৃত 'হুমকি ও প্রলোভনের নীতি’ আর কোনোভাবেই বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে না।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাধারণত যে কৌশলকে 'গাজর ও লাঠির নীতি' বা সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি সামান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্রলোভন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, সেই চিরাচরিত ও আধিপত্যকামী কৌশলের কার্যকারিতা এখন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ এবং ভিত্তিহীন বলে তিনি দাবি করেছেন।
তেহরানের পক্ষ থেকে এই ধরনের আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে উত্থাপিত হলো, যখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনার নানামুখী উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তবে ইরান তার নিজেদের মৌলিক এবং কৌশলগত অবস্থানে যে কতটা অনড়, আপসহীন এবং অবিচল, স্পিকার কলিবফের এই বলিষ্ঠ ঘোষণাই তার সবচেয়ে বড় এবং অকাট্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং বা আইআরআইবি-র পরিবেশিত বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পার্সটুডে তাদের এক বিস্তারিত, তথ্যবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে পার্লামেন্ট স্পিকারের এই বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে।
মোহাম্মদ বাকের কলিবফ তার একটি বিশেষ এবং সুদূরপ্রসারী বার্তায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে ইরানের সুনির্দিষ্ট এবং যৌক্তিক কিছু দাবি রয়েছে যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা বা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন, তেহরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সাতটি মৌলিক ও অপরিহার্য শর্ত যদি সম্পূর্ণরূপে এবং নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া হয়, কেবল তবেই বর্তমানের এই দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসন করে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত, টেকসই এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।
এই পূর্বনির্ধারিত শর্তগুলোর বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ বা আপসকারী চুক্তিতে ইরান যে আর কখনোই আবদ্ধ হবে না, রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে সেই বার্তাই অত্যন্ত সুকৌশলে এবং কড়া ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং বিশেষ করে যেকোনো জটিল কূটনৈতিক সংকট নিরসনে মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা সবসময়ই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাব বিস্তারকারী বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে।
বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশ কিছু শক্তিশালী দেশ ও সংস্থা ইরান এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরির আপ্রাণ ও নিরলস চেষ্টা চালিয়ে আসছে, যেন একটি সর্বজনগ্রাহ্য চুক্তিতে উপনীত হওয়া যায়।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ অত্যন্ত জোরালোভাবে জানিয়েছেন যে, ইরানের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাতটি শর্তের কথা ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের কাছে একাধিকবার এবং অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
এর সহজ অর্থ হলো, পশ্চিমা বিশ্ব বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বৈরী পক্ষগুলোর কাছে ইরানের এই সুস্পষ্ট এবং আইনসম্মত দাবিগুলো মোটেও কোনো নতুন বা অজানা বিষয় নয়। মধ্যস্থতাকারীরা খুব ভালো করেই অবগত আছেন যে, তেহরান তার অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ঠিক কোন কোন বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দাবি করছে।
সুতরাং, এই মৌলিক শর্তগুলোকে সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটিয়ে কেবল মৌখিক আশ্বাস, ভাসা-ভাসা প্রতিশ্রুতি বা সাময়িক কোনো ছাড়ের বিনিময়ে স্বাধীনচেতা ইরানকে আর আলোচনার টেবিলে বসানো বা কোনো অসম নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা মোটেও সম্ভবপর হবে না।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বমঞ্চে ইরানের এই চূড়ান্ত অনড় এবং ইস্পাতকঠিন অবস্থানের পেছনে রয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘনের এক অত্যন্ত হতাশাজনক ও অগ্রহণযোগ্য ইতিহাস।
বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো বিগত কয়েক দশক ধরে বারবার ইরানের ওপর একাধারে কঠোর থেকে কঠোরতর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক অবরোধ আরোপের মাধ্যমে নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করেছে, আবার ঠিক অন্যদিকে অত্যন্ত সীমিত, শর্তযুক্ত এবং ধীর গতির অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদানের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়েছে।
মোহাম্মদ বাকের কলিবফ তার সাম্প্রতিক এই বার্তার মাধ্যমে মূলত পশ্চিমাদের এই দ্বিচারিতা এবং দ্বৈত নীতিরই কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে মনে করেন, একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইরান তার জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং নিজস্ব শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক ও প্রযুক্তিগত অধিকারের প্রশ্নে কোনো ধরনের বহিঃশক্তির অযাচিত হুমকির কাছে কখনোই মাথা নত করবে না।
একই সাথে, সামান্য কিছু সাময়িক অর্থনৈতিক সুবিধার প্রলোভনে পড়ে বা নিষেধাজ্ঞার ভয়ে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়ার মতো কোনো ঐতিহাসিক ভুলও তেহরান ভবিষ্যতে আর কখনোই করবে না।
যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা আইআরআইবি বা পার্সটুডের ওই নির্দিষ্ট প্রতিবেদনে এই সাতটি শর্তের একেবারে বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের ধারণা ও পূর্ববর্তী আলোচনাগুলোর প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এই শর্তগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত রয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো-ইরানের ওপর থেকে সমস্ত অন্যায়, বেআইনি ও একতরফা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করা, বিদেশে আটকে পড়া ইরানের সমস্ত বৈধ আর্থিক সম্পদ কালবিলম্ব না করে অবমুক্তকরণ, এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতা পরিবর্তনের অজুহাতে কোনো পক্ষ যেন একতরফাভাবে এবং বেআইনিভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে তার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, লিখিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনগত গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা প্রদান করা।
অতীতের বিভিন্ন চুক্তিভঙ্গের চরম তিক্ত ঘটনাপ্রবাহ থেকে বাস্তবমুখী শিক্ষা গ্রহণ করে ইরান এখন আর কেবল পশ্চিমা নেতাদের মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর বিন্দুমাত্র নির্ভর করতে রাজি নয়, বরং তারা চায় অত্যন্ত বাস্তবসম্মত, দৃশ্যমান ও প্রয়োগযোগ্য পদক্ষেপ, যা তাদের অর্থনীতিকে প্রকৃত অর্থেই সুরক্ষিত করবে।
পার্লামেন্ট স্পিকারের এই সময়োপযোগী বক্তব্য মূলত ইরানের সামগ্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র, সামরিক কাঠামো এবং নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত, অভিন্ন ও সুদৃঢ় মানসিকতারই এক নিখুঁত ও প্রামাণ্য প্রতিফলন।
এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বস্তরে এই অমোঘ বার্তাই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে, ভবিষ্যতে যেকোনো গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হতে হবে সমতা, পারস্পরিক অবিচল শ্রদ্ধা এবং একে অপরের শর্তের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমানের চরম ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাতময় পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের যে ব্যাপক ও দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে, সেই অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ বাকের কলিবফের এই মন্তব্য এক অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং গভীর তাৎপর্য বহন করে।
ইরান মূলত বিশ্ববাসীকে প্রমাণ করে দেখাতে চাইছে যে তারা এখন আর কোনো আন্তর্জাতিক বা অর্থনৈতিক চাপের মুখে দুর্বল বা অসহায় নয়, বরং নিজেদের ন্যায্য অধিকার ও শর্ত আদায়ের ক্ষেত্রে তারা পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং কৌশলগত, সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে এক শক্তিশালী অবস্থানে অধিষ্ঠিত রয়েছে।
যে সকল আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে একটি গ্রহণযোগ্য, ভারসাম্যপূর্ণ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানোর জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তাদের জন্যও কলিবফের এই দ্ব্যর্থহীন বার্তা একটি অনেক বড় ধরনের সতর্কতা এবং পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
এর প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতিতে মধ্যস্থতাকারীদের এখন পশ্চিমা বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের কাছে এই অত্যন্ত কঠিন এবং অকাট্য বাস্তবতাটি সাহসিকতার সাথে তুলে ধরতে হবে যে, ইরানকে কোনো ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ, সামরিক আগ্রাসনের ভীতি প্রদর্শন বা সামান্য অর্থনৈতিক সুবিধার প্রলোভন দেখানোর মাধ্যমে বশীভূত করার যে পুরোনো কৌশল তারা এতদিন ধরে সযত্নে অনুসরণ করে আসছে, তা বর্তমানে চূড়ান্ত ও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
এখন যদি সত্যিই কোনো অর্থবহ কূটনৈতিক সমাধান বা টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর আন্তরিক সদিচ্ছা তাদের থেকে থাকে, তবে অবশ্যই নিজেদের দীর্ঘদিনের অহংকার, আধিপত্য বিস্তারের ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে ইরানের উত্থাপিত যৌক্তিক এবং ন্যায্য দাবিগুলোকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে মূল্যায়ন করতে হবে।
পরিশেষে, এটা অত্যন্ত নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ইরানের এই অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, সুচিন্তিত এবং শর্তযুক্ত কূটনৈতিক অবস্থান বৈশ্বিক কূটনীতির আগামী দিনগুলোর সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এক অনেক বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করবে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং কূটনীতিবিদরা জোরালোভাবে মনে করছেন।
'হুমকি ও প্রলোভনের নীতি'র মতো সম্পূর্ণ সেকেলে, অকার্যকর এবং ব্যর্থ কৌশল থেকে অতিসত্বর বেরিয়ে এসে পশ্চিমা বিশ্বকে এখন একটি সম্পূর্ণ নতুন, সম্মানজনক, সমতাভিত্তিক এবং বাস্তবমুখী কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই।
মোহাম্মদ বাকের কলিবফের এই অত্যন্ত বলিষ্ঠ এবং দ্ব্যর্থহীন বার্তা থেকে এটি আজ দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তার জাতীয় আত্মমর্যাদা, নিজস্ব অখণ্ডতা এবং সার্বভৌম অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে এক বিন্দু পরিমাণও ছাড় দিতে আর মোটেও প্রস্তুত নয়।
সম্পূর্ণ শর্তহীন, বাধামুক্ত এবং চাপমুক্ত একটি সুষ্ঠু কূটনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমেই কেবল একটি সম্মানজনক, সর্বজনগ্রাহ্য ও টেকসই আন্তর্জাতিক সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভবপর হতে পারে।
অন্যথায় বর্তমানের এই বিরাজমান ও দমবন্ধ করা কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভবিষ্যতেও যে দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থেকে যায়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না, যা কোনো পক্ষের জন্যই শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ ফলাফল বয়ে আনবে না।