শনিবার, একত্রিশে অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ কার্যনির্বাহী সফরের সমাপ্তিতে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, কৃষ্ণসাগরে চলাচলকারী বেসামরিক নৌযানগুলোর ওপর যে কোনো ধরনের আক্রমণ ওই অঞ্চলের বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এ ধরনের উসকানিমূলক বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষের জন্যই কোনো সুফল বা ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে না। বরং এটি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক চরম হুমকির মুখে ঠেলে দেবে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শনিবার দিনের প্রথম ভাগে এই পূর্বনির্ধারিত ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কার্যনির্বাহী সফরে ইস্তাম্বুলে এসে পৌঁছান। তার এই সফরের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এরদোয়ান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে অবহিত করেন যে, তাদের এই একান্ত বৈঠকে কৃষ্ণসাগরে নৌ চলাচলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রহণ করা বিভিন্ন জোরদার পদক্ষেপ নিয়ে অত্যন্ত বিশদ ও গভীর আলোচনা হয়েছে।
তুরস্ক যে প্রথম থেকেই এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অবাধ নৌ চলাচল এবং স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি 'সক্রিয়' ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে, সে বিষয়টিও তুর্কি প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন। আঙ্কারা বরাবরই কৃষ্ণসাগরকে একটি শান্তির জলসীমায় পরিণত করার পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেন।
তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক উত্তেজনার যে বিপজ্জনক বিস্তৃতি ঘটছে, তার সমান্তরালে তারা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছেন যে সংঘাতের এই ধ্বংসাত্মক আঁচ এখন ধীরে ধীরে কৃষ্ণসাগরের বিশাল জলসীমাতেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
এটিকে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও অবাধ নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর এক মারাত্মক হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, এই ধরনের আগ্রাসী আক্রমণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, এই হামলাগুলোর পেছনে যে বা যারাই থাকুক না কেন, কিংবা তারা নিজেদের স্বপক্ষে যত বড় যুক্তি বা অজুহাতই উপস্থাপন করুক না কেন, আঙ্কারা কোনো অবস্থাতেই বেসামরিক নৌযানের ওপর এই ধরনের আক্রমণকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেবে না।
এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল আচরণ করার এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের যাবতীয় সামরিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য তিনি জরুরি ও জোরালো আহ্বান জানান।
কৃষ্ণসাগরের বুকে পুনরায় শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তুরস্কের অবিচল প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এরদোয়ান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন যে, আঙ্কারা ভবিষ্যতেও বিবদমান উভয় পক্ষের সাথে তাদের নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখবে।
এরপর তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আরও একবার তুরস্কের মাটিতে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে পেরে নিজের গভীর আনন্দ ও সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে এই আনন্দের মাঝেই ইউক্রেনে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ এবং রক্তপাত এখনো বিন্দুমাত্র না কমায় তিনি গভীর হতাশা ও আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং এর ফলে সৃষ্ট অকল্পনীয় ধ্বংসযজ্ঞের কথা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করে এরদোয়ান ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ, যারা এই নির্মম যুদ্ধে নিজেদের অমূল্য জীবন হারিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মাধ্যমে সমগ্র ইউক্রেনবাসীর প্রতি তার আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
কূটনৈতিক উপায়ে এই দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য আন্তর্জাতিক মহলে যে নতুন করে উদ্যোগ ও গতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তাকে তুরস্ক অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে বলে এরদোয়ান জানান।
এই প্রসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এই কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো যুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে এবং তুরস্ক এই সমস্ত শান্তি উদ্যোগকে সর্বান্তকরণে স্বাগত জানায়।
আঙ্কারা বিশ্বাস করে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত চাপ এবং আন্তরিক মধ্যস্থতাই পারে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক পরিসমাপ্তি ঘটাতে। কূটনীতির শক্তি ও কার্যকারিতার ওপর নিজের অগাধ আস্থার কথা পুনর্ব্যক্ত করে তুর্কি নেতা স্মরণ করিয়ে দেন যে, এর আগে তুরস্কের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতা ও আতিথ্যেই ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে যে ঐতিহাসিক আলোচনাগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তা বিশ্ববাসীকে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে কূটনীতির মাধ্যমে আসলেই কত বড় ও সুনির্দিষ্ট ইতিবাচক ফলাফল অর্জন করা সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে বহুল প্রশংসিত তার সেই বিখ্যাত রাজনৈতিক দর্শনের কথা পুনরায় উচ্চারণ করে তিনি বলেন, আমরা বর্তমানের এই চরম সংকটময় ও সংঘাতপূর্ণ পর্যায়ে দাঁড়িয়েও অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এবং বিশ্ববাসীকে এই বার্তাই দিতে চাই যে, একটি ন্যায্য, সম্মানজনক ও ন্যায়সঙ্গত শান্তিতে প্রকৃতপক্ষে কেউই পরাজিত হয় না।
বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উভয় পক্ষই দীর্ঘমেয়াদে বিজয়ী হয়। ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার জন্য তুরস্ক তাদের সক্ষমতার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সব ধরনের সম্ভাব্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেন।
ইউক্রেনে একটি স্থায়ী ও টেকসই শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে চলমান আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাগুলো কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা বিষয়ক যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে আরও একটি নতুন ও শক্তিশালী গতি লাভ করবে বলে এরদোয়ান গভীর আশা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, তারা কেবল ইউক্রেনের সাথেই নয়, বরং রাশিয়ার সাথেও ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে এই শান্তি প্রক্রিয়াকে সামনের দিকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা পোষণ করেন।
ভূ-কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে ইউক্রেনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, আজ আমরা আরও একবার আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার ইউক্রেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং পরম স্বাধীনতার প্রতি আমাদের শর্তহীন ও অবিচল প্রতিশ্রুতির কথা পুনরায় নিশ্চিত করছি।
ইউক্রেনের এই কঠিন সময়ে তুরস্ক যে তাদের পাশে এক বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, সেই বার্তাই এই যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার চমৎকার রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার কথা তুলে ধরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বাণিজ্যিক অর্জনের ওপরও ব্যাপকভাবে আলোকপাত করেন।
তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, ২০২২ সালে তুরস্ক ও ইউক্রেনের মধ্যে যে ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা গত পহেলা অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এই চুক্তিটি কার্যকর হওয়া দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই যুগান্তকারী চুক্তির অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আমাদের দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ এক হাজার কোটি বা দশ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা আমরা নির্ধারণ করেছিলাম, আমাদেরকে সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের আরও এক ধাপ কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
বক্তবের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে এরদোয়ান তুরস্কের ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের অসীম সাহসিকতা এবং ইউক্রেনের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসার কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ২০২২ সালে এই ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চরম প্রতিকূলতা এবং প্রাণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও যে সমস্ত তুর্কি কোম্পানি ইউক্রেনের মাটি ছেড়ে যায়নি, বরং সেখানে অবস্থান করে দেশটির অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করেছে, তারা আগামী দিনে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর এবং এর সার্বিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে।
তুরস্কের এই বিনিয়োগকারীরা কেবল ব্যবসায়ী নয়, বরং তারা দুই দেশের মধ্যকার অকৃত্রিম বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক আস্থার এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে কাজ করছে, যা আগামী দিনে ইউক্রেনের নবজাগরণে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।