শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২৬
১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের সুযোগ শেষ বলে দাবি লাপিদের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:২২ পিএম

নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের সুযোগ শেষ বলে দাবি লাপিদের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত সাধারণ নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক গভীর ও জটিল অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী উদ্ভূত এই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান বিরোধীদলীয় শীর্ষ নেতা ইয়াইর লাপিদ অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেছেন যে, দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সামনে নতুন করে সরকার গঠনের আর কোনো বাস্তবসম্মত সুযোগ অবশিষ্ট নেই।

 

গত সাতাশে অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের পর থেকে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকার গঠন নিয়ে যে তীব্র জটিলতা ও মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তারই পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় লাপিদ এই মন্তব্য করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মতে, ইসরায়েলের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম 'কান'-এর দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেশব্যাপী ভোট গণনার কাজ চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

 

১২০ সদস্যবিশিষ্ট ইসরায়েলি পার্লামেন্ট বা নেসেটের প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, কোনো একক দল বা জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম একষট্টিটি আসনের ম্যাজিক ফিগার বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি।

 

প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী 'লিকুদ' জোট নেসেটে তিপ্পান্নটি আসন লাভে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, ইয়াইর লাপিদের অবস্থান থাকা বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত 'চেঞ্জ' বা পরিবর্তন জোট আটচল্লিশটি আসন লাভ করেছে।

 

সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দেশটির আরব রাজনৈতিক দলগুলো, যারা সম্মিলিতভাবে উনিশটি আসন দখল করে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়ামক শক্তি বা 'কিংমেকার' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জোটের প্রাপ্ত এই তিপ্পান্নটি আসনের দিকে সরাসরি ইঙ্গিত করে ইয়াইর লাপিদ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স' (সাবেক টুইটার)-এর নিজস্ব অ্যাকাউন্টে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক পোস্ট করেছেন।

 

তিনি লিখেছেন যে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সম্বল এখন এটুকুই; তিনি নেপথ্যে যত চেষ্টাই করুন না কেন, এই আসন সংখ্যা নিয়ে তার সামনে সরকার গঠনের আর কোনো আইনি বা গাণিতিক উপায় নেই। লাপিদ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সদ্য সমাপ্ত হওয়া বিদায়ী নেসেটে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের আসন সংখ্যা ছিল আটষট্টিটি।

 

সেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান থেকে বর্তমানে তিপ্পান্ন আসনে নেমে আসাকে নেতানিয়াহুর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য একটি বিশাল ও নজিরবিহীন বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এই বিরোধী নেতা।

 

এবারের নির্বাচনে ইসরায়েলের সাধারণ জনগণের অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের বিষয়টিও ইয়াইর লাপিদ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত ১৯৯৯ সালের পর থেকে ইসরায়েলের নির্বাচনি ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

 

লাপিদ তার নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের এই আসন প্রাপ্তিকে কোনো নিরঙ্কুশ বা 'নকআউট' জয় হিসেবে দাবি করেননি, বরং তিনি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে 'পয়েন্টের ভিত্তিতে জয়' বা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকা একটি কৌশলগত বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

তবে সরকার গঠন নিয়ে বর্তমানে ইসরায়েল যে এক অভূতপূর্ব ও জটিল অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেই রূঢ় বাস্তবতাকে তিনি অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনের এই জটিল সমীকরণ নিয়ে লাপিদ অত্যন্ত খোলামেলা ও সতর্ক মন্তব্য করেছেন।

 

তিনি তার শুক্রবারের বার্তায় স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, নির্বাচনের প্রচারণার ডামাডোল এখন শেষ, এখন সবচেয়ে কঠিন কাজটি তাদের সামনে অপেক্ষমাণ-আর তা হলো একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনের চেষ্টা করা। নির্বাচনি প্রচারণার উন্মুক্ত পরিবেশের সাথে জোট গঠনের রুদ্ধদ্বার আলোচনার বিস্তর পার্থক্য তুলে ধরে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, সরকার গঠন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক শিল্প।

 

এটি সাধারণত ক্যামেরার ঝলকানি ও গণমাধ্যমের আড়ালে, ছোট ও সংরক্ষিত কোনো কক্ষে, অত্যন্ত ধীরগতিতে এবং সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। তিনি তার অগণিত সমর্থকদের এই জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ায় ধৈর্য ধারণ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে অত্যন্ত সততার সাথে বলেছেন যে, এই পথচলা অত্যন্ত কঠিন হবে এবং তিনি এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারছেন না।

 

নির্বাচনের চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার জন্য ইসরায়েলের নির্বাচন কমিশন এখন নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী ৪ঠা নভেম্বর সকল যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন শেষে এই আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে এবং সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী তা ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।

 

প্রেসিডেন্ট তখন দলগুলোর প্রাপ্ত আসন এবং জোট গঠনের সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট বা আইনি অধিকার প্রদান করবেন। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এবং একটি বিকল্প সরকার গঠনের জন্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নেপথ্যে ব্যাপক আলোচনা ও দরকষাকষি শুরু হয়ে গেছে।

 

ইসরায়েলের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্র 'ইয়েদিওথ আহরোনথ'-এর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই বৃহস্পতিবার কট্টর ডানপন্থী ও কট্টরপন্থী দল 'জিউইশ পাওয়ার'-এর প্রধান নেতা ইতামার বেন-গভির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন।

 

এই অত্যন্ত গোপনীয় বৈঠকে তারা একটি ডানপন্থী সরকার কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল কী হতে পারে, তা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে।

 

জিউইশ পাওয়ার দলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে যে, আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে ইসরায়েলে যাতে কোনোভাবেই একটি তথাকথিত 'বামপন্থী সরকার' গঠিত হতে না পারে, তা ঠেকাতে নেতানিয়াহুর সাথে তাদের দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, নেতানিয়াহু-বিরোধী জোটেও সরকার গঠনের নানামুখী তৎপরতা অত্যন্ত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। 'ডেমোক্র্যাটস' দলের শীর্ষ নেতা ইয়ার গোলান বিরোধী 'চেঞ্জ' জোটের অন্যান্য নেতাদের প্রতি অত্যন্ত জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা আরব দলগুলোর সাথে রাজনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে নিজেদের পূর্ববর্তী অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে তা পুনর্বিবেচনা করেন।

 

একটি বিকল্প ও নেতানিয়াহু-বিহীন সরকার গঠনের আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইয়ার গোলান গত বৃহস্পতিবার 'ইউনাইটেড আরব লিস্ট' বা রা'আম পার্টির শীর্ষ নেতা মানসুর আব্বাসের সাথে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ করেছেন।

 

এর আগেও গোলান ভবিষ্যতে গঠিত হতে যাওয়া যেকোনো বিরোধী জোটে রা'আম পার্টিকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে অত্যন্ত জোরালো মত প্রকাশ করেছিলেন। তবে বিরোধী জোটের ভেতরেও এই আরব দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে রয়েছে তীব্র মতপার্থক্য ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব।

 

উদাহরণস্বরূপ, ডানপন্থী ধর্মনিরপেক্ষ দল 'ইসরায়েল বেইতেইনু'-এর নেতা আভিগদোর লিবারম্যান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এমন কোনো জোট সরকার গঠনের ঘোর বিরোধী, যে সরকারের মন্ত্রিসভা বা জোটে আরব দলগুলোর কোনো ধরনের অন্তর্ভুক্তি বা অংশগ্রহণ থাকবে।

 

এই আদর্শিক বিভাজন বিরোধী জোটের জন্য একটি বড় বাধা। গাণিতিক হিসাবে, 'চেঞ্জ ব্লক' এবং আরব দলগুলোর হাতে সম্মিলিতভাবে মোট সাতষট্টিটি আসন রয়েছে, যা নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট।

 

কিন্তু আরব দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে চেঞ্জ ব্লকের কোনো অংশ নয়। তাদের সাথে রাজনৈতিক সহযোগিতা করার বিষয়ে বিরোধী দলীয় নেতাদের মধ্যকার এই সুস্পষ্ট ও আদর্শিক মতপার্থক্য নেতানিয়াহু-বিহীন একটি বিকল্প সরকার গঠনের পথে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ও জটিল অন্তরায় হিসেবে রয়ে গেছে, যা আগামী দিনগুলোতে ইসরায়েলের রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।