তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমরবিশারদদের মতে, ওয়াশিংটনের এই অতি-আগ্রাসী সামরিক কৌশল হয়তো তাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বা কৌশলগত ফলাফল বয়ে আনবে না। বরং, বারবার সামরিক হামলার মাধ্যমে তৈরি হওয়া অস্তিত্বের সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা তেহরানকে তার দীর্ঘদিনের নীতি পরিবর্তন করে চূড়ান্ত প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকেই দ্রুততর গতিতে ধাবিত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি অদূর ভবিষ্যতে ইরানের ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের পক্ষ থেকে তৃতীয় দফায় কোনো বৃহৎ আকারের ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়, তবে তা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
এ ধরনের হামলা ইরানের সেই রাজনৈতিক ও সামরিক কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানকে রাতারাতি অত্যন্ত শক্তিশালী ও জনসমর্থনপুষ্ট করে তুলবে, যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে একটি স্বাধীন পারমাণবিক অস্ত্রাগার গড়ে তোলার পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে আসছে।
যুদ্ধের ফাঁদ এবং পরাশক্তির মনস্তত্ত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক মাহদি নিকসেফাত মোতলাঘ এবং কিয়াভাশ কালহোরের এক অত্যন্ত সুগভীর ও গবেষণাধর্মী নিবন্ধে পরাশক্তিগুলোর যুদ্ধের মনস্তত্ত্বের এক বিপজ্জনক দিক উন্মোচন করা হয়েছে।
তাদের মতে, কোনো প্রভাবশালী বা আধিপত্যকামী রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক ফাঁদ তৈরি হয় ঠিক তখনই, যখন কোনো একটি যুদ্ধ শুরু করার প্রাথমিক সিদ্ধান্তকে যেকোনো মূল্যে সঠিক ও যৌক্তিক প্রমাণ করার জন্য সেই যুদ্ধকে অনন্তকাল ধরে চালিয়ে যাওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
এমন চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে, যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়ার বিষয়টিকে ব্যর্থতা হিসেবে স্বীকার করার পরিবর্তে, সেটিকে আরও বড় আকারের এবং ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রধান যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়।
অথচ ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা হলো, যুদ্ধের ব্যাপ্তি ও আর্থিক ব্যয় যত বাড়তে থাকে, কাঙ্ক্ষিত ও চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জনের পথ তত বেশি কণ্টকাকীর্ণ ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ইরান নীতির ক্ষেত্রেও ঠিক এমনই এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
নিছক সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে প্রাথমিক লক্ষ্য নিয়ে ওয়াশিংটন তেহরানের সাথে এই সংঘাতে জড়িয়েছিল, সেই যুদ্ধই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতা, প্রভাব এবং মিত্রদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন রাজনৈতিক সাময়িকী 'দ্য আটলান্টিক'-এ গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণী মহলের একটি অতি-আত্মবিশ্বাসী ধারণার কথা উঠে এসেছে।
তাদের বিশ্বাস ছিল, বছরের পর বছর ধরে চলা কঠোর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধ ও নানামুখী চাপের মুখে ইরান ভেতর থেকে অনেকটাই দুর্বল, ভঙ্গুর এবং প্রতিরোধহীন হয়ে পড়েছে। ফলে এই মুহূর্তে যদি দেশটিতে নতুন করে কোনো বড় ধরনের সামরিক আঘাত হানা যায়, তবে তা হয়তো ইরানের বর্তমান সরকার কাঠামোর পতনের পথকে সুগম করবে।
যদিও ইরানে পুনরায় সর্বাত্মক হামলা চালানোর বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি, তবে মার্কিন প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী অংশ এখনো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরেকটু বৃদ্ধি করলেই হয়তো কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে।
নিয়ন্ত্রণযোগ্য শত্রুর ধারণায় কৌশলগত ভ্রান্তি বিশ্লেষকেরা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এই ধারণার মধ্যে একটি পুরোনো ও মারাত্মক কৌশলগত ভুল হিসাব দেখতে পাচ্ছেন। মার্কিন প্রশাসনের এই বিশ্বাসটি মূলত এই ভ্রান্ত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, যেকোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে সামরিকভাবে কিছুটা দুর্বল করে ফেলতে পারলেই তার আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ নীতি নিজেদের সম্পূর্ণ ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কিন্তু যুদ্ধবিগ্রহের বাস্তবতা হলো, সামরিকভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েও কোনো সার্বভৌম দেশ নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার্থে প্রতিপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া অসম রাজনৈতিক শর্ত মেনে নিতে দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।
ইরানের মতো একটি আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং আদর্শগতভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাটিকে চরমভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক মধ্যপ্রাচ্যনীতিতে ইরানকে একটি 'নিয়ন্ত্রণযোগ্য শত্রু' বা 'ম্যানেজেবল এনিমি' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, মার্কিন প্রশাসন একদিকে মনে করে ইরান এতটা গুরুত্বপূর্ণ যে তার সাথে কোনো ধরনের সংঘাত গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, আবার অন্যদিকে তারা আত্মবিশ্বাসী যে ইরান সামরিকভাবে এতটা দুর্বল যে তারা কখনো সংঘাতের পূর্বনির্ধারিত নিয়ম বা গতিপথ পরিবর্তন করার সক্ষমতা রাখে না।
কোনো পরাশক্তির জন্য এমন একজন পরিচিত শত্রুর উপস্থিতি অনেক সময়ই বিদেশে সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখা এবং নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মিত্রদের অস্ত্র বিক্রি করার একটি কার্যকর অজুহাত হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন প্রতিপক্ষের ওপর সামরিক আঘাত হানতে গিয়ে উল্টো মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তাই চরম হুমকির মুখে পড়ে যায়, যা পরাশক্তির সামরিক নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ইরাক যুদ্ধের শিক্ষা এবং ইরানের বাস্তবতা সামরিকভাবে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের অবকাঠামো ধ্বংস করার সক্ষমতা থাকা আর যুদ্ধের পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়, তা প্রমাণের জন্য ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় হওয়া উচিত ছিল।
২০০৩ সালের সামরিক আগ্রাসনে সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে উৎখাত করা সম্ভব হলেও, সেখানে একটি স্থিতিশীল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। ইরানের ক্ষেত্রেও নিছক সামরিক হামলার মাধ্যমে একটি সরকারকে দুর্বল করে তার চূড়ান্ত রাজনৈতিক পতন ঘটানোর এই মার্কিন পরিকল্পনার পথে অনেক বড় ও জটিল বাধা রয়েছে।
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো, ধর্মভিত্তিক জাতীয় পরিচয়ের সুদৃঢ় ভিত্তি এবং দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক অবরোধ ও চরম চাপের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা দেশটিকে এক অভাবনীয় টিকে থাকার সক্ষমতা প্রদান করেছে।
ফলে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এই ভাবনাটি সম্পূর্ণ অবাস্তব যে, নির্দিষ্ট কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা বা সামরিক কমান্ডারকে সরিয়ে দিলেই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। বস্তুত, কোনো রাষ্ট্র সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং প্রতিরোধের সক্ষমতা অনেক সময়ই অটুট থাকতে পারে।
তৃতীয় দফা হামলার ঝুঁকি এবং পারমাণবিক সমীকরণ ২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান এই সংঘাতের হিসাবনিকাশকে এক ভিন্ন ও জটিল মাত্রায় নিয়ে গেছে।
এসব হামলায় ইরানের অবকাঠামোগত ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ওয়াশিংটন ও তেল আবিব তাদের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, অর্থাৎ ইরানকে শর্তহীন আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, তা অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
এখন যদি ওয়াশিংটন মনে করে যে, ইরানের সম্পূর্ণ ও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার অন্য কোনো পথ তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য হানিকর, তবে তারা নিজেরাই একটি অন্তহীন যুদ্ধের ফাঁদে আটকা পড়বে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে, আগের হামলাগুলোর ব্যর্থতা ঢাকতে এবং মার্কিন সামরিক শক্তির হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের অজুহাতে তৃতীয় দফায় আরও বড় আকারের হামলার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো হতে পারে। কিন্তু ইরানও আর আগের অবস্থায় নেই।
ক্রমাগত হামলার অভিজ্ঞতা তাদের রাষ্ট্র পরিচালনা ও সামরিক রণকৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। তারা এখন বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি এবং প্রতিপক্ষের ওপর পাল্টা আঘাত হানার নতুন নতুন কৌশল আয়ত্ত করেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ইরানের নীতিনির্ধারকেরা যদি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তাদের বর্তমান প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও ভবিষ্যতের কোনো নতুন এবং অস্তিত্ববিনাশী হামলা ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে তাদের যুক্তি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে।
ইতিমধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মহলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জোর দাবি উঠেছে। যদিও ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, তবে বারবার অস্তিত্বের সংকটে পড়লে শুধু আত্মরক্ষার চূড়ান্ত ঢাল হিসেবেই তারা এই চরম পথে অগ্রসর হতে পারে।
স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতার অপরিহার্যতা সংঘাতের এই অন্তহীন ও ধ্বংসাত্মক চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এবং নতুন করে কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে হলে উভয় পক্ষেরই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে একটি আমূল পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।
কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতির মৌখিক আশ্বাস দিয়ে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের মতো চরম সিদ্ধান্ত থেকে নিবৃত্ত রাখা কার্যত অসম্ভব। এর পরিবর্তে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর একটি যুক্তিসংগত, সম্মানজনক ও যাচাইযোগ্য সীমাবদ্ধতা আরোপের পাশাপাশি, তাদের ওপর ভবিষ্যতে নতুন করে কোনো সামরিক হামলা না চালানোর একটি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
নিজেদের বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে আধিপত্য ধরে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ব্যর্থ ও উদ্দেশ্যহীন যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং বিশ্বজুড়ে নিজেদের অবস্থান হারানোর মধ্যে যে বিশাল কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে, তা অনুধাবন করতে হবে।
যে পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানোর অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে, সেই ক্রমাগত সামরিক হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতাই উল্টো ইরানকে চূড়ান্ত অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে পারমাণবিক অস্ত্রের পথে ঠেলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।