রবিবার, নভেম্বর ১, ২০২৬
১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসার কোনো ইচ্ছা নেই, জানাল ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:২৪ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসার কোনো ইচ্ছা নেই, জানাল ইরান
ছবি : Collected

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে কোনো ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা বা সমঝোতায় বসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা তেহরানের নেই।

 

পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার এই দৃঢ় বার্তাটি এমন এক সময়ে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

 

ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার আলী নিকজাদ সম্প্রতি একটি সংসদীয় অধিবেশনে দেওয়া এক অত্যন্ত কড়া ও সুনির্দিষ্ট ভাষণে সরকারের এই অনমনীয় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

 

তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি অত্যন্ত শীতল ও সংঘাতময় রূপরেখা ফুটে উঠেছে।

 

সংসদীয় অধিবেশনে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া ওই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে আলী নিকজাদ দেশের সেনাবাহিনী এবং সাধারণ জনগণের অকল্পনীয় সহনশীলতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে মন্তব্য করেন যে, গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বের নানামুখী অবরোধ এবং সামরিক হুমকির বিপরীতে ইরানি জাতি যে মহাকাব্যিক সহনশীলতা প্রদর্শন করেছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন।

 

একই সাথে তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীর অপ্রতিরোধ্য শক্তি এবং লৌহকঠিন ইচ্ছাশক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এই বিষয়গুলোই আজ যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের পশ্চিমা ও আঞ্চলিক মিত্রদের বাস্তবতার এক কঠিন দেয়ালের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে।

 

পশ্চিমা বিশ্ব এতদিন ধরে যে কল্পনার জগতে বাস করছিল এবং ভাবছিল যে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তেহরানকে নতজানু করা সম্ভব, সেই ভ্রান্ত ধারণার চিরতরে অবসান ঘটেছে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে দাবি করেন।

 

ক্ষমতার এই দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুযুদ্ধে কে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করবে, সে বিষয়েও ইরানের এই শীর্ষ আইনপ্রণেতা অত্যন্ত স্পষ্ট একটি পূর্বাভাস দিয়েছেন। তিনি পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর উদ্দেশ্যে একপ্রকার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, তাদের এখন এই ধ্রুব সত্যটি মেনে নিতেই হবে যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তিকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প পথ খোলা নেই।

 

আলী নিকজাদ তাঁর বক্তৃতায় অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, এই দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুমুখী সংঘাতে শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ও সার্বভৌম ইরানি জাতি নয়, বরং আমেরিকানরাই একসময় পরাস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।

 

তাঁর এই মন্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, তেহরান এখন আর কেবল প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতির ওপর নির্ভর করছে না, বরং তারা মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়েও নিজেদের পূর্ণ শক্তিমত্তার প্রমাণ দিতে চাইছে।

 

আন্তর্জাতিক অবরোধ ও নানাবিধ সামরিক হুমকির প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, বহির্বিশ্বের যে কোনো ধরনের প্রচণ্ড চাপের মুখেও তেহরান তাদের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে যাওয়ার কোনো চিন্তাভাবনা করছে না।

 

এর পেছনে সবচেয়ে বড় যুক্তি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানকে দেওয়ার মতো নতুন বা আকর্ষণীয় কোনো প্রস্তাবই আর অবশিষ্ট নেই। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, যে আলোচনা কেবলই সময়ক্ষেপণ এবং নতুন করে অবরোধ আরোপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেই কূটনীতির ফাঁদে ইরান আর দ্বিতীয়বার পা দিতে রাজি নয়।

 

বরং তারা তাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর ভিত্তি করেই নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কঠিন পথ বেছে নিয়েছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি ইরানের অতীত প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আলী নিকজাদ বলেন, এই মহান ইরানি জাতি তাদের চরম বৈরী প্রতিপক্ষদেরও এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আঙিনায় অর্থবহ আলোচনার জন্য অতীতে পর্যাপ্ত সুযোগ প্রদান করেছিল।

 

তাঁর এই কথার মাধ্যমে মূলত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই সদিচ্ছার বিপরীতে ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কী পেয়েছে, তার এক কঠোর সমালোচনা উঠে এসেছে তাঁর কণ্ঠে।

 

তিনি অভিযোগ করেন যে, বিশ্বশান্তির আশায় আলোচনার অবারিত সুযোগ দেওয়ার পরও ইরানকে কেবল বারবার নির্লজ্জ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে এবং নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তিগুলো বারবার প্রমাণ করেছে যে, তারা আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাশীল নয়।

 

সবচেয়ে গুরুতর যে অভিযোগটি আলী নিকজাদ তাঁর ভাষণে উত্থাপন করেছেন, তা হলো ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর বেআইনি ও ন্যক্কারজনক হামলার প্রসঙ্গ। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন যে, ইরান যখন তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক শক্তি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কথা বারবার নিশ্চিত করেছে, ঠিক তখনই তাদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনার ওপর সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বোমাবর্ষণ এবং অন্তর্ঘাতমূলক হামলা চালানো হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই ইঙ্গিত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের বিভিন্ন পারমাণবিক অবকাঠামোতে বিদেশি মদদপুষ্ট সন্দেহভাজন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের দিকেই নির্দেশ করে। এই ধরনের ধারাবাহিক উসকানিমূলক ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ডই মূলত ইরানকে আলোচনার পথ থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে বলে তিনি মনে করেন।

 

এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর নেতিবাচক ঢেউ আছড়ে পড়ছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল জুড়ে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই প্রকাশ্য ও চূড়ান্ত অস্বীকৃতি আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণকে আরও অনেক বেশি জটিল করে তুলবে। কারণ, ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক তদারকি বা নতুন চুক্তির আওতায় আসতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে, তবে তা স্বভাবতই পশ্চিমা বিশ্বকে আরও কঠোর ও চরমপন্থী ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে প্ররোচিত করতে পারে।

 

অন্যদিকে, ইরানও তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও সুসংহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। ফলে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা এবং যেকোনো মুহূর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক সংঘাতের এক গভীর শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

 

পরিশেষে বলা যায়, আলী নিকজাদের এই ভাষণকে কেবল একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত বা আবেগতাড়িত মতামত হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি মূলত ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহল এবং রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার একটি সমন্বিত ও অত্যন্ত সুচিন্তিত কণ্ঠস্বর, যা পশ্চিমাদের প্রতি একটি পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা বহন করছে।

 

তেহরান সমগ্র বিশ্বকে এটি প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর যে, কেবল অর্থনৈতিক অবরোধ কিংবা সামরিক ভয়ভীতি প্রদর্শন করে একটি সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রকে তাদের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিতে বাধ্য করা যায় না।

 

যতদিন পর্যন্ত না পশ্চিমা বিশ্ব তাদের অতীত আধিপত্যবাদী মানসিকতা থেকে সম্পূর্ণরূপে বেরিয়ে এসে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন করছে, ততদিন পর্যন্ত এই বৈশ্বিক পারমাণবিক বিতর্কের কোনো শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান আশা করা যায় না। বাস্তবতার এই কঠিন দেয়াল পেরিয়ে যুযুধান দুই পক্ষ কবে নাগাদ একটি অর্থবহ ও সম্মানজনক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবে, তা এখন সম্পূর্ণভাবে ভবিষ্যতের গর্ভেই লুকিয়ে আছে।

 

- আল জাজিরা