সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে তীব্র হামলার জোরালো সম্ভাবনা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে তীব্র হামলার জোরালো সম্ভাবনা
ছবি : Collected

বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ওয়াশিংটন ডিসিতে বর্তমানে চরম উৎকণ্ঠা ও জল্পনা-কল্পনা বিরাজ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র ইরানের ভূখণ্ডে নতুন করে এক ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালো গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।

 

সোমবার, ২ নভেম্বর প্রকাশিত স্বনামধন্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য আটলান্টা’-এর এক বিশেষ ও গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে যখন পুরো দেশ রাজনৈতিক উত্তাপে ফুটছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই হোয়াইট হাউসের ভেতরে এমন একটি সুদূরপ্রসারী সামরিক পদক্ষেপের গোপন ব্লুপ্রিন্ট বা নীলকশা তৈরি করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনটিতে শক্ত দাবি করা হয়েছে।

 

সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামরিক অভিযানের এই যোগসূত্র অত্যন্ত জটিল ও কৌশলগত। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের আগেই ইরানে এই পরিকল্পিত হামলা শুরু হতে পারে কি না, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগন থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো সুনিশ্চিত বার্তা পাওয়া যায়নি।

 

তবে সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দ্য আটলান্টা জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক শীর্ষস্থানীয় উপদেষ্টা এবং নীতিনির্ধারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমটিকে নিশ্চিত করেছেন যে, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরপরই খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হবে।

 

মার্কিন প্রশাসনের অন্দরমহলে এই বিষয়টি নিয়ে এখন শেষ মুহূর্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, কারণ এই হামলার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর অত্যন্ত গভীর প্রভাব পড়বে।

 

এই সম্ভাব্য নতুন হামলার প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে চলতি বছরের শুরুর দিকের ঘটনাপ্রবাহের দিকে। আটলান্টার ওই একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর তাদের প্রথম ধাপের সামরিক হামলা পরিচালনা করেছিল, তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পেন্টাগন এবং তার সামরিক উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল।

 

তাকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অনেক আগেই একটি সফল পরিণতির মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে।

 

দীর্ঘ কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই সংঘাতের কোনো চূড়ান্ত বা সন্তোষজনক পরিসমাপ্তি ঘটেনি, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে চরম হতাশ এবং একইসঙ্গে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সময়মতো এই সামরিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এর পেছনের কারণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের কঠোরভাবে খুঁজছেন।

 

ফেব্রুয়ারির সেই অভিযানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য কেন অর্জিত হলো না এবং কেন এই সংঘাত এতটা অপ্রত্যাশিতভাবে দীর্ঘায়িত হলো, তা নিয়ে তিনি এখন তার প্রশাসনের শীর্ষ সামরিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের দিকে একের পর এক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন।

 

হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই সামগ্রিক ব্যর্থতার দায়ভার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রশাসনের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার যেকোনো একজনের কাঁধে চাপাতে পারেন। এই দুজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল ডন কেইন।

 

ধারণা করা হচ্ছে, এদের মধ্যে অন্তত একজনকে এই দীর্ঘায়িত সংঘাতের বলি হতে হবে এবং প্রেসিডেন্টের রোষানলে পড়ে নিজেদের পদ হারাতে হতে পারে অথবা চরম তিরস্কারের সম্মুখীন হতে হবে।

 

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অবস্থান হোয়াইট হাউসে অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। দ্য আটলান্টা-কে দেওয়া একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে এবং হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ বলয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের জনপ্রিয়তা এখন একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে।

 

সূত্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দাবি করেছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান নিয়ে হেগসেথ প্রেসিডেন্টকে বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি বাড়িয়ে বলেছিলেন। তিনি পরিস্থিতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন যা বাস্তবে রূপ নেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।

 

এর পেছনে হেগসেথের একটি বিশেষ মানসিকতার কথা উল্লেখ করেছে সূত্রটি। দাবি করা হয়েছে যে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী সর্বদা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খুশি রাখার এবং তার মন জুগিয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

 

তিনি সামরিক বাস্তবতার চেয়ে প্রেসিডেন্টের পছন্দকেই বেশি প্রাধান্য দেন। সূত্রটির ভাষায়, "প্রেসিডেন্ট ঠিক যা শুনতে পছন্দ করেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ অবিকল সেই কথাগুলোই অত্যন্ত গুছিয়ে বলতে বেশ পটু।"

 

এই তোষামোদকারী মানসিকতার কারণেই আজ মার্কিন প্রশাসনকে এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দীর্ঘমেয়াদী সামরিক জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। অভ্যন্তরীণ এই চরম উত্তেজনা এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েনের মাঝেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

সোমবার আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশ্যে এক জোরালো বার্তা প্রদান করেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সুরে ঘোষণা করেন যে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান এই যুদ্ধাবস্থা বা সামরিক সংঘাত হয়তো খুব শিগগিরই তার চূড়ান্ত সমাপ্তির দিকে এগোচ্ছে।

 

নির্বাচনের ঠিক আগের মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের এই ধরনের বক্তব্য একদিকে যেমন তার ভোটারদের আশ্বস্ত করার একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, অন্যদিকে এটি সামরিক বাহিনীকে একটি দ্রুত সমাধানে পৌঁছানোর জন্য পরোক্ষ মানসিক চাপ হিসেবেও কাজ করছে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার এই ঘোষণার আড়ালে এক ভয়ংকর সামরিক প্রস্তুতির খবরও বেরিয়ে আসছে। একাধিক মার্কিন এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবার ইরানে দীর্ঘমেয়াদী কোনো যুদ্ধে না জড়িয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, স্বল্পমেয়াদী কিন্তু নজিরবিহীন তীব্রতার একটি ভয়াবহ হামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

 

পেন্টাগন এমন একটি কৌশলগত ছক কষছে যেখানে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক, পারমাণবিক এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে অভাবনীয় মাত্রায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হবে, যাতে তারা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।

 

মার্কিন সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য হলো, এই তীব্র আঘাতের মাধ্যমেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বা সামরিকভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা। যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের রণপ্রস্তুতির খবর প্রকাশ্যে আসার পর ইরানও নিশ্চুপ বসে নেই। তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট ভাষায় চরম হুঁশিয়ারি প্রদান করা হয়েছে।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এবং সামরিক কমান্ডাররা সরাসরি হুমকি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি পুনরায় তাদের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের আগ্রাসন বা সামরিক হামলা শুরু করে, তবে সেই যুদ্ধের পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

 

ইরান অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকতে পারে, কিন্তু সেই যুদ্ধ কখন, কোথায় এবং কীভাবে শেষ হবে, তার চূড়ান্ত নির্ধারণ করবে কেবল ইরান।

 

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সুবিধামতো ইরানে একটি আকস্মিক হামলা চালিয়ে একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করবে বা সংঘাতের সমাপ্তি টানবে-তেহরান কোনোভাবেই সেটি হতে দেবে না। বরং তারা এমন এক পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, যা সমগ্র অঞ্চলকে এক ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যই নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বিশাল টার্নিং পয়েন্ট হতে যাচ্ছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে হোয়াইট হাউসের যেকোনো হঠকারী বা সুপরিকল্পিত সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

 

বিশ্ব সম্প্রদায় এখন চরম উৎকণ্ঠার সঙ্গে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তেহরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার যেকোনো প্রত্যক্ষ সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

- দ্য আটলান্টা